প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এক ছাতার নিচে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই থাকবে। কিন্তু ছাতাই তো খোলা হলো না, বৃষ্টি পড়ছে অথচ ছাতা খোলা হয়নি।’
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
‘অঙ্গীকার থেকে অনুশীলন : রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি; বাংলাদেশের নির্বাচন-২০২৬’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমি কেন বলছি এ সরকারের যাওয়ার সময় হয়েছে? কারণ যতটুকু সংস্কার ও বিচার করার সুযোগ ছিল, তাদের সেই সক্ষমতা এখন শেষ প্রান্তে। তাদের দম ফুরিয়ে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘সরকারের ভেতর থেকেই সংখ্যালঘু নির্যাতনের তথ্য খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার বাস্তবতাকে আড়াল করে।’
সরকারের মুখপাত্রের বক্তব্যের উদাহরণ টেনে দেবপ্রিয় বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সরকারের ভেতরের একজন অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি, যিনি উপদেষ্টা নন, বক্তা হিসেবে প্রেস কনফারেন্সে বলেন, ২০২৫ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ৬৪৫টি হামলা হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭১টি সাম্প্রদায়িক। এটি কী ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতি, তার একটি উদাহরণ।
গত ১৯ জানুয়ারি পুলিশের নথি পর্যালোচনা করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য-সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি হামলার ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭১টি ঘটনায় ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ পেয়েছে পুলিশ। এসব তথ্য যাচাইকৃত ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগপত্র ও সারা দেশের তদন্ত অগ্রগতির ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেবপ্রিয় বলেন, ‘সরকারি হিসাবেই এক বছরে ৬৪৫টি হামলা হয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর।
তিনি বলেন, ‘যখন বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার বিকৃতির রূপ নেয়, তখন সেই সরকারের যাওয়ার সময় হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই আমাদের নতুন উত্তরণের পথে যেতে হবে।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে আরো সুস্পষ্ট ও প্রগতিশীল অঙ্গীকার আসতে পারত। তবে যেটুকু এসেছে, সেটুকুর বাস্তবায়ন নজরদারির মধ্যেই রাখতে হবে।’
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখনো অংশগ্রহণের ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে। নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতের রাজনৈতিক শক্তি—সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
ভোটে অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা বলেন ভোট না দিয়ে মত প্রকাশ করা উচিত, তারা এই মুহূর্তে দেশের জন্য উপকারী চিন্তা করছেন না। ভোটই আমাদের শক্তি।’
ভোটের সময় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, ‘সহিংসতাহীন একটি নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সরকার যদি শেষ ভালো কাজটি করে যেতে পারে, তাহলে ইতিহাসের পাতায় তাদের কিছুটা জায়গা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’