চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এখন নজিরবিহীন মানবিক ও শিল্প বিপর্যয়ের মুখে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষ, সংঘর্ষ ও সর্বশেষ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ধারাবাহিক ঘটনায় শুধু বিনিয়োগের ভাবমূর্তিতেই ধাক্কা লাগেনি, বরং হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকাও বন্ধ রয়েছে। এই বিপর্যয়ের সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে নেতৃত্ব দেওয়া প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের সাতটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক। এই গ্রুপের এই কারখানাগুলো গত ১৭ অক্টোবর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় জিন্স রপ্তানিকারক প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের সব কারখানা একযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ৩৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক।
আমরা আবারও কাজে ফিরব। দ্রুত কাজে ফিরতে না পারলে আমাদেরই না খেয়ে থাকতে হবে।’ একই গ্রুপের এনএইচটি ফ্যাশনের শ্রমিক ইকবাল হোসেন হতাশা মেশানো কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কারখানা খোলার জন্য আন্দোলন করছি। এখন বউয়ের স্বর্ণ আর জমানো টাকায় হাত দেওয়ার চিন্তা করছি। এসব শেষ হলে না খেয়ে থাকতে হবে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কিছু শ্রমিকের ভাঙচুর, মারামারি ও লুটপাটের জেরে প্যাসিফিক জিন্স কর্তৃপক্ষ শ্রম আইন অনুযায়ী সাতটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এই বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্যাসিফিক জিন্স, জিন্স ২০০০, ইউনিভার্সেল জিন্স, এনএইচটি ফ্যাশন, প্যাসিফিক অ্যাকসেসরিজ, প্যাসিফিক ওয়ার্কওয়্যার ও প্যাসিফিক অ্যাটায়ার্স। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আইনত বন্ধ থাকাকালে শ্রমিকরা কোনো বেতন পাবেন না।
প্রয়াত শিল্পপতি নাসির উদ্দিনের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ ৪২ বছরের সাধনায় একটি থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ ৫০টিরও বেশি দেশে এককভাবে বিপুল জিন্স প্যান্ট রপ্তানি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে জিন্সের মোট রপ্তানি মূল্যের প্রায় ১৫ শতাংশই করে থাকে প্যাসিফিক জিন্স। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ছয় কোটি পিস জিন্স রপ্তানি করা এই গ্রুপ টানা সাতটি স্বর্ণপদকসহ ২৪টি জাতীয় রপ্তানি পুরস্কার এবং তিনবার এইচএসবিসি বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে।
প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ কেবল রপ্তানি সাফল্যের জন্যই নয়, তাদের আর্থিক ভিতের জন্যও পরিচিত। বর্তমানে এই গ্রুপের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার কোটি টাকা। তাদের কোনো ব্যাংকঋণ নেই; মুনাফা থেকেই তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। নিজের হাতে গড়া এমন একটি অনন্য উচ্চতার শিল্প গ্রুপকে রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়ায় হতাশা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের এই পরিণতি বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিল্প খাতে বিরাজমান অস্থিরতারই অংশ। গত ১০ মাসে সিইপিজেডসহ চট্টগ্রামে মোট ১৬টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলস্বরূপ সব মিলিয়ে ৫৯ হাজার ৩৭৩ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের শিল্প খাতে নেতৃত্ব দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের এমন পরিণতি শুধু ৩৫ হাজার শ্রমিকের জীবিকা কেড়ে নেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের বিনিয়োগের ভাবমূর্তির জন্য এক চরম খারাপ বার্তা বহন করেছে। বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের সাতটি কারখানা একযোগে বন্ধের ঘটনা চট্টগ্রামে এটাই প্রথম। যে প্রতিষ্ঠানকে এমন দুঃসময় মোকাবেলা করতে হচ্ছে, অতীতে সেই প্যাসিফিক জিন্সে কোনো বদনাম ছিল না। শ্রমিকদের বেতন নিয়ে কখনো অসন্তোষ দেখিনি সেখানে।’ তিনি বলেন, দায়িত্বশীলরা যথাযথ ভূমিকা নিলে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা ৩৫ হাজার কর্মী রাতারাতি বেকার হতেন না। জানা গেছে, গত ১৬ অক্টোবর সিইপিজেডের অ্যাডামস ক্যাপস এবং জিহং মেডিক্যাল প্রোডাক্টের আটতলা ভবনে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হাজার কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়, যার ফলে প্রায় তিন হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।