প্রাথমিক বিদ্যালয় ফাঁকা, মাদরাসায় উপচে পড়া শিক্ষার্থী

আপলোড সময় : ১৩-১০-২০২৫ ০৮:১৪:৩৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-১০-২০২৫ ০৮:১৪:৩৭ অপরাহ্ন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে, আর তার বিপরীতে মাদরাসায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। স্কুলের বেঞ্চ ফাঁকা পড়ে থাকলেও মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা উপচে পড়া ভিড়ে বসে পাঠ নিচ্ছে। অভিভাবকরা চান, সন্তানরা এমন পরিবেশে পড়াশোনা করুক যেখানে শিক্ষার মান ভালো এবং হাতেকলমে শেখার সুযোগ বেশি। নতুন শিক্ষাক্রমে আস্থাহীনতা এবং কিছু শিক্ষক দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে স্কুল থেকে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার হার বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

 

 

সোমবার (১৩ অক্টোবর) ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নগণ্য—সারি সারি বেঞ্চ ফাঁকা পড়ে আছে। অন্যদিকে, মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, এমনকি কিছু মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নান্দাইল উপজেলার মুশল্লী ইউনিয়নের কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করলে দেখা গেছে, প্রত্যেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি হতাশাজনক।

 
দুপুরের পর নগরকচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ২০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র সাতজন উপস্থিত ছিল। তৃতীয় শ্রেণিতে ১২ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিল ছয়জন, আর চতুর্থ শ্রেণিতে ১৪ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র পাঁচজন।

 

এ নগরকচুরি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুন্নাহার শিউলি জানান, তার বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৮৭ জন হলেও উপস্থিতি খুবই কম। কারণ হিসাবে তিনি পাশের মাদরাসাগুলোকে দায়ী করেন।

 

 

অন্যদিকে, মোরাগালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৮২ জন। সেখানে দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণিতে ১৯ জনের স্থলে উপস্থিত ছিল ৫ জন। চতুর্থতে ৭ জনের স্থলে ৪ জন ও পঞ্চমে ১৯ জনের স্থলে উপস্থিত ছিল ৬ জন। 

মোরাগালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিয়ানা আক্তার জানান, স্কুলের পাশে মাদরাসা থাকায় এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মাদরাসায় যাওয়াকে বেছে নিচ্ছে। দিন দিন স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের আবার স্কুলমুখী করাও সম্ভব হচ্ছে না।

 
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে এই পরিস্থিতি আরো বাড়তে পারে।’

 

ওই দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের পর পাশে থাকা দারুস সুন্নাহ নামের একটি মাদরাসায় গেলে দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক কক্ষে শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। শিক্ষকরা মেঝেতে গাদাগাদি করে বসানো শিক্ষার্থীদের পাঠদান পরিচালনা করছেন।

মাদরাসার প্রধান আতিকুর রহমান জানান, তার মাদরাসায় মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৭০০ জন। এদের অনেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এসে এখানে নতুন করে ভর্তি হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঠদান চলে। প্রতি মাসে ৫০০ টাকা বেতন দিয়েও অভিভাবকরা সন্তানদের এখানে পড়াতে আগ্রহী। তাদের অনেকেই সন্তানদের আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিতে চান না। আতিকুর রহমানের দাবি, এখানে পড়াশোনার মান খুবই উন্নত।

দ
নান্দাইলের একটি মাদরাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কক্ষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

এই দাবির বাস্তবতাও দেখা গেছে। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। তাদের হাতের লেখা পরিষ্কার ও পরিপাটি, আর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইলে বেশিরভাগই জানায়, এক থেকে দুই বছর আগে তারা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত। কিন্তু সেখানে পড়াশোনার মান ভালো না থাকায় তাদের অভিভাবকরা এখানে ভর্তি করিয়েছেন।

শিক্ষার্থীরা জানায়, এখানে পড়তে তাদের ভালো লাগে। উপস্থিত কয়েকজন অভিভাবক বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন আর পড়াশোনা বলতে কিছু নেই। পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী নিজের নাম-ঠিকানাও ঠিকভাবে লিখতে পারে না। এ অবস্থায় বাধ্য হয়েই তারা সন্তানদের মাদরাসায় ভর্তি করেছেন।

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২ হাজার ১৪০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০১৯ সালে ভর্তি হয়েছিল ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৬৭ জন শিক্ষার্থী। ২০২০ সালে ভর্তি হয় ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৪২৪ জন, ২০২১ সালে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯৮ জন, ২০২২ সালে ৭ লাখ ৮৪ হাজার ৬৯৬ জন, ২০২৩ সালে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪২০ জন এবং ২০২৪ সালে ভর্তি হয়েছে ৭ লাখ ৪৩ হাজার ১৬৬ জন। গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার ৬৮১ জন শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে।

অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাক্রমে মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে। হাতেকলমে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হলেও এতে আস্থা রাখতে পারছেন না অনেকেই। তাদের অভিযোগ, শিশুদের স্কুলে এমন কিছু বিষয় শেখানো হচ্ছে, যা তারা পরিবার থেকেই স্বাভাবিকভাবে শেখে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মাদরাসা, ইংরেজি মাধ্যম কিংবা এনজিও পরিচালিত স্কুল অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত।

এ কারণে এক শ্রেণির শিক্ষার্থী মাদরাসায় যাচ্ছে, কেউ পড়ছে কিন্ডারগার্টেনে, আবার কেউ ভর্তি হচ্ছে গ্রামীণ এলাকায় এনজিও পরিচালিত স্কুলে। অর্থনৈতিক চাপে কিছু শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়ে কর্মে নেমে পড়ছে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামে পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বেশির ভাগ অভিভাবক সন্তানদের আর স্কুলে পাঠান না। তাদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো কেবল হিসাব-নিকাশ শেখা—যা জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট।

আল আমীন নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী একটানা কয়েক দিন অনুপস্থিত থাকলেও শিক্ষকরা খোঁজ নেন না। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের কোনো যোগাযোগ নেই। কোনো শিক্ষার্থী কয়েক দিন ধারাবাহিকভাবে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে সে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনুকূল না ভেবে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা বলেন, ‘ওইসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিশ্চয়ই দায়িত্বশীল নন। তারা সঠিকভাবে পাঠদান করার পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্বও পালন করছেন না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. উবায়দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা অত্যন্ত হতাশাজনক তথ্য। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। কেন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম—তা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সম্পাদকীয় :

সম্পাদক : সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ 

ন্যাশনাল মিডিয়া হাউজ লিঃ 

ঠিকানা : রিসোর্সফুল পল্টন সিটি, ৮ম তলা, ৫১-৫১/এ, পুরানা পল্টন। ঢাকা-১০০০.

ফোন : 0963 8932 732, ই মেইল : news@nationaltimes24.com

অফিস :