২৩ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির পেছনে যত কারণ!

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ১২-০৯-২০২৫ ১০:৫২:০৫ পূর্বাহ্ন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:  ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবির পেছনে যত কারণ!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনে অতীতে কখনও জয়ের কাছাকাছি যাওয়া, এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই আসতে পারেনি ইসলামী ছাত্রশিবির। জামায়াতে ইসলামীর এই সহযোগী সংগঠনটি এবার ভূমিধস জয় পেয়েছে।

ছাত্র শিবিরের এই জয়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি সমর্থিত ছাত্রদলের প্রার্থীদের ভোটের ফারাকটা অনেক। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভরাডুবি হয়েছে।

ডাকসু নির্বাচনে ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে ৯টিতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি তিনটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সদস্য পদ রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে ১১টিতে জয়ী হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সদস্যরা। একটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। অন্যটিতে জয়ী বাম-সমর্থিত প্রার্থী। এরমধ্যে কোনো পদেই ছাত্রদলের প্যানেলের নেতারা জয়লাভ করতে পারেনি, এমনকি ভোটের ব্যবধানও ছিল অনেক বেশি। ডাকসুর রাজনীতিতে ছাত্র দলের এই ভয়াবহ পরাজয় কেন?

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে জাতীয় নির্বাচনের কয়েকমাস আগে ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা। এর কোনো প্রভাব আগামী সংসদ নির্বাচনে ও জাতীয় রাজনীতিতে পড়তে পারে কি না, এমন প্রশ্নও কেউ কেউ তুলছেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল নানা অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুললেও নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও দায়ী করছে অনেক নেতা।


পরিকল্পনার ঘাটতি

প্রথম থেকেই ছাত্রদলের কার্যক্রম চলেছে এডহক ভিত্তিতে। ছিল না সমন্বিত পরিকল্পনা। নির্বাচনের শেষ দিকে বিএনপির নজর ডাকসুর দিকে ঘুরলেও কার্যকরী কৌশল নিতে পারেনি তারা। জয় নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ছাত্রদল একক প্যানেল দিলেও ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট গঠনের চেষ্টা করেনি।

অন্যদিকে ছাত্রশিবির কৌশলে ভিন্ন ব্যানারে প্রার্থী দিয়ে ভোটের হিসাব নিজেদের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়।


সাংগঠনিক দুর্বলতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে নিপীড়নের মুখে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠনের প্রভাব তৈরি হয়নি।


বামপন্থী সংগঠন ও জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে ছাত্রশিবির গোপনে সাংগঠনিক বিস্তার ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায়ও শিবির গোপনে কাজ করেছে বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।

আস্থার সংকট

বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালে ছাত্রদলের দাপট ও ক্যাম্পাসে গণরুম, নিপীড়নের অভিযোগ থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ ওঠে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হলগুলোতে গণরুম ও নিপীড়ন আবার ফিরে আসবে কি না—এই প্রশ্নে ছাত্রদলের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকট রয়েছে। সেই ন্যারেটিভ ভাঙতে পারেনি ছাত্রদল।”

তার মতে, ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে এখনো সে ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি না হওয়ায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা সুবিধা পেয়েছে।


👉 বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠনগত দুর্বলতা, কৌশলের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতা—এই তিনটি কারণে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের বিপর্যয় ঘটেছে


এদিকে, যেভাবে পরাজিত হয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, সেই বাস্তবতা সম্পর্কে সংগঠনটির এবং বিএনপির ধারণা ছিল না বলে তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে মনে হয়েছে। এছাড়া তাদের প্রস্তুতিতেও ঘাটতি ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন।

তবে রাজনীতিকদেরই অনেকে মনে করছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা যেতে চায়, তাদের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের জন্যই বার্তা রয়েছে এবং সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

রাজনীতিকদের অনেকে আবার ডাকসুর প্রভাবের বিষয়কে সেভাবে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ডাকসু নির্বাচন থেকে সমগ্র বাংলাদেশকে বিবেচনা করার কোনো কারণ নেই।

অবশ্য ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে চলেছে পর্যালোচনা,বিশ্লেষণ। যদিও ছাত্রদল ডাকসুর ফলাফল প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি অস্থির হলে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, সেই দায় এড়াতে ছাত্রদল ও বিএনপি বাস্তবতা মেনে নিচ্ছে বলে নেতাদের কেউ কেউ বলছেন।

এছাড়া বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ডাকসুর ফলাফল নিয়ে যাতে কোনো সংঘর্ষ বা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল না হয়, সে ব্যাপারে মঙ্গলবার সেই নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকেও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। শেষপর্যন্ত ভিন্ন কোনো অবস্থানে যায়নি বিএনপি।

ছাত্রদলের ঘাটতি বা দুর্বলতা ছিল কোথায়

ডাকসুতে বিপর্যয়ের পর বিএনপির ছাত্র সংগঠনটি ভোটে অস্বচ্ছতা, অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ করেছে প্রকাশ্যে। ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাদের অনেকে এমন অভিযোগও করছেন যে, ডাকসুর ভোটের ব্যাপারে ছাত্রলীগের সঙ্গেও ছাত্রশিবিরের আঁতাত হয়েছিল। ছাত্রশিবির অবশ্য এসব অভিযোগ মানতে রাজি নয়। তবে ছাত্রদল ও বিএনপির নেতৃত্ব প্রাথমিকভাবে নিজেদের কিছু দুর্বলতার বিষয়ও চিহ্নিত করেছে বলে জানা গেছে।

প্রথমত, ডাকসু নির্বাচনের শুরু থেকে তাদের কর্মকাণ্ড চলেছে এডহক ভিত্তিতে। ছিল না সমন্বিত পরিকল্পনা। শেষপর্যায়ে যখন বিএনপির নেতৃত্ব ডাকসুর দিকে নজর বাড়িয়েছে, তখন ছাত্রদল ও মূল দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হয়েছেন।

কারণ হিসেবে বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বড় সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল প্রার্থীরা জয়ী হবেন, কিন্তু এতটা বিপর্যয় হবে-সেই ধারণা তাদের ছিল না।নির্বাচনে যে নানারকম কৌশল থাকে, তাতেও তাদের ঘাটতি ছিল।

বিজয় হবে, এমন ধারণা থেকে ছাত্রদল একক প্যানেল দিয়েছিল। তবে ছাত্রশিবিরের বাইরে অন্য প্যানেলগুলো যে সংখ্যায় ভোট পেয়েছে, তা ছাত্রদলের ভোটের সঙ্গে যোগ করলে শিবিরের ভোটের চেয়ে সংখ্যায় বেশি হয়। সেখানে ছাত্রদলের ঐক্যবদ্ধ প্যানেল তৈরির কোনো চেষ্টা ছিল না। কিন্তু ছাত্রশিবির কোনো কোনো পদে তাদের সংগঠনের বাইরে প্রার্থী করে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নামে বা ভিন্ন ব্যানারে প্যানেল দিয়েছিল।

যে শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ইতিহাসে কখনো প্রকাশ্যে প্যানেল দিতে পারেনি, সেই সংগঠন এবার প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বাজিমাত দেখিয়েছে। ডাকসুর ২৮ পদের মধ্যে ২৩ পদেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে শিবিরের প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। যার বিপরীতে ছাত্রদল একটি পদেও বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারেনি। শিবিরের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও ফলাফলে ভোটের সংখ্যায় ছিল ব্যপক তারতম্য। ছাত্রদল থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন শিবিরের প্রার্থীরা। ছাত্রদলের এ ভূমিধস পরাজয়ে হতবাক অনেকেই। কেন এই ভরাডুবি হলো, সেই হিসাব মিলাচ্ছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অনৈক্য আর প্রস্তুতির অভাবÑ নির্বাচনে ভরাডুবির মূল কারণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাবির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। একাধিকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন ডাকসুর নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয় তখন থেকেই ছাত্রশিবির ভোটের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। অন্যদিকে ছাত্রদলের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুত ছিল না। এমনকি কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নেতাও এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। এমনকি তারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টাও করেন। তবে শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় তারা সেভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্রদল নেতা জানান, ডাকসুতে ছাত্রদল যে প্যানেল দিয়েছিল তা অনেক নেতার পছন্দ হয়নি। আবার অনেকে মনোনয়ন না পেয়ে মনোক্ষুণœ ছিলেন। এ ছাড়া সিনিয়র কয়েকজন নেতা ভোট করতে আগ্রহী ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে হাইকমান্ডের গ্রিন সিগনাল পাননি। ফলে এসব নেতা ছাত্রদলের প্যানেলের পক্ষে কাজ করেননি। দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং ও অনৈক্যের কারণে নিজেদের নেতাকর্মীরাও ছাত্রদলকে ভোট দেননি। এর প্রমাণ মেলে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটে। সব সেন্টারেই শিবিরের তিন প্রার্থী সমান ভোট পেলেও ছাত্রদলের ভোটে ছিল অনেক তারতম্য। এ ছাড়া ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণার পর মাত্র ২০ দিন সময় পাওয়ায় তারা ক্যাম্পাসের সব ভোটারের কাছে যেতেও পারেননি। এসব কারণেই মূলত ছাত্রদলের ভোটের মাঠে সুরও তুলতে পারেনি।

এসবের বাইরেও আরও কিছু কারণ দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক ছাত্রনেতারা। তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনীতি ও শিক্ষার্থীদের মনোজগতে চিন্তার একটা পরিবর্তন এসেছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় সংগঠনগুলোর আধিপত্যের বাইরে গিয়ে একটা বদল বা নতুন পরিবেশ চায়। ছাত্রদলের বিরুদ্ধে বিগত দিনে ক্যাম্পাসে আধিপত্যের রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে। আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও ফের ছাত্রদল পুরোনো রূপে ফিরে আসবে এমন আশঙ্কা অনেকের। তারা বলছেন, গত ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলের নেতারা অনেক জায়গায় চাঁদাবাজি, দখলদারিতে জড়িয়েছেন। এসব বিবেচনায় তারা ছাত্রশিবিরকে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারত ও ট্যাগের রাজনীতি নিয়ে একটা বিরূপ ধারণা ছিল। সে সবেরও প্রভাব পড়েছে ডাকসুর নির্বাচনে।

তারা আরও বলেন, ডাকসু নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ নির্বাচন প্রমাণ করেছে, বর্তমান প্রজন্ম কী ধরনের নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। তাদের ভোটের ফল স্পষ্ট বার্তা দেয়, পুরোনো ধাঁচের স্বার্থকেন্দ্রিক, দুর্নীতিগ্রস্ত ও দখলদারিত্বের রাজনীতি আর তারা মেনে নেবে না। জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ফল বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে সতর্কবার্তা।

তারা বলেন, আজকের তরুণরা স্বপ্ন দেখে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সৎ নেতৃত্বের। তারা চায় একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেখানে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা টেন্ডারবাজি থাকবে না। আর যাদের মধ্যে এসব অসুস্থ রাজনীতি চর্চা হবে বর্তমান প্রজন্ম ঘৃণাভরে সেই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করবে।


সার্বিক বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, সরকারি দলের বিপরীতে সব সময় একটি মনোভাব তৈরি হয়। সেই মনোভাব তৈরি হয়েছিল ছাত্রদের মধ্যে। কারণ বিএনপি আগামী দিনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারে এটা এমন ধারণা সবার মধ্যে। যদি বিএনপি ক্ষমতায় চায় তাহলে ছাত্রদল হয়তোবা ছাত্রলীগের মতো আগ্রাসী ভূমিকায় আসতে পারে এ শঙ্কা ছিল অনেকের মধ্যে। তারা ছাত্রলীগের সমান বিবেচনা নিয়েছিল ছাত্রদলকে। এই ভয়ে ভীত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে ভোট দেয়নি এটা আমার ধারণা।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর বেশির ভাগ মানুষ ক্ষমতার একটা পরিবর্তন চায়। মানুষ ভালো আচরণ চায়। সব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছাত্রশিবির ভালো আচরণ করে, তারা চাঁদাবাজি-দখলবাজি লুটপাটের মধ্যে নেই। এটাও ভোটে বড় প্রভাব রাখতে পারে।

নির্বাচনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বড় প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন ডাকসুর সাবেক জিএস ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে যারা থাকুক না কেন এর সাংগঠনিক দায়দায়িত্ব, পরিকল্পনা বা নেপথ্যে শিবির ছিল। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিবিরকে রায় দিয়েছে বলে আমার মনে হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন যেভাবে আধিপত্য দেখিয়েছে সেটার বিরুদ্ধে শিবিরকে ভোট দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটা সুস্পষ্ট প্রতিবাদ।

শিবিরকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে ডা. মুশতাক আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন থেকে হল দখল, গেস্টরুমের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার। তারা একটা ভালো বিকল্প খুঁজছে। নির্বাচনে যত প্যানেল দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে শিবিরকে বেছে নেওয়ার কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হল দখলের ইতিহাস নেই। যদিও রাজশাহী, চট্টগ্রামে তারা হল দখল করে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেছেন, পতিত সরকারের দোসরদের কারণে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি হয়েছে। এ নির্বাচন বিএনপিকে একটি সতর্ক সংকেত দিয়েছে।

অন্যদিকে ডাকসুর সাবেক ভিপি নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ছাত্রদল গত ১৬ বছরে হাসিনা সরকারের আমলে কিছুই করতে পারেনি। তা ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে তরুণরা চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব দেখতে চান না। এ জন্য ছাত্রদল ডাকসুতে ডুবে গেছে।



বিশ্লেষকদের অনেকে আবার ছাত্রদলের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রশ্নও তুলছেন।তাদের বক্তব্য হচ্ছে, অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ক্যাম্পাসগুলোতে ক্ষমতার দাপটে ছাত্রদলের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল।

আর আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনে যেমন ক্যাম্পাসগুলোতে আবাসিক হল দখল ও গণরুমে নিপীড়নের আভিযোগ রয়েছে। অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ও হলগুলোতে গণরুম ও নিপীড়নের অভিযোগ ছিল।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, হলগুলোতে গণরুম ও নিপীড়ন আবার ফিরে আসবে কি না, এই প্রশ্নে ছাত্রদলের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকট রয়েছে। সেই ন্যারেটিভ ছাত্রদল ভাঙতে পারেনি বা শিক্ষার্থীদের অস্থার অভাব দূর করতে পারেনি।

ছাত্রশিবির যেহেতু এখনও সে ধরনের কোনো ন্যারেটিভ বা ধারণা তৈরি হয়নি। ফলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিবির একটা সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ