ড. মাহফুজ পারভেজ
রাজনৈতিক মেরুকরণে জামায়াত ও বিএনপি?
আপলোড সময় :
০৮-০৮-২০২৫ ১১:৩০:৩৫ পূর্বাহ্ন
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শনিবারের জাতীয় সমাবেশের আয়োজক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হলেও বক্তৃতা ও অংশগ্রহণে প্রাধান্য পেয়েছে সমমনা দলগুলো। মতাদর্শিকভাবে কাছাকাছি দলগুলো তো ছিলই, রাজনৈতিক কৌশল ও নির্বাচনী ঐক্যের দিক থেকে নিকটবর্তী দলগুলোর প্রাধান্যও ছিল দৃশ্যমান। জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে দীর্ঘদিনের পুরনো মিত্র বিএনপি ছিল অনুপস্থিত। তাদেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। জামায়াতের পক্ষে বলা হয়, পিআরের পক্ষে থাকা দলগুলোকে কেবল জাতীয় সমাবেশে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। ফলে জামায়াতের জাতীয় সমাবেশ সমমনাদের রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক ঐক্য ও মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর এই রাজনৈতিক মেরুকরণ যে বিএনপি‘কে বাদ দিয়ে, তা-ও প্রকাশ্যে এসেছে। সবার মধ্যেই একটি সংশয়ের উদয় হয়েছে, রাজনৈতিক মেরুকরণে পথে চলেছে জামায়াত ও বিএনপি?বাংলাদেশের পোশাক
Pause
Mute
Remaining Time -18:54
Unibots.com
৭ দফাকে সামনে রেখে জাতীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে গুরুত্ব পেয়েছে সামনের নির্বাচনে পিআর বা প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতি বহাল করার বিষয়টি। বেশ কিছুদিন ধরেই জামায়াতসহ কয়েকটি ছোট-বড় রাজনৈতিক দল প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে চলেছে, যেখানে একটি দল বা প্রার্থীর আসন সংখ্যা নির্ধারিত হবে তাদের পাওয়া ভোটের অনুপাতে। অর্থাৎ, যে দল যত শতাংশ ভোট পায়, তারা তত শতাংশ আসন পায়, এই নীতি মান্য করা হয়। নির্বাচনী এলাকা বা আসন ভিত্তিক সরাসরি নির্বাচন হয় না। জাতীয় সমাবেশের বক্তারা নমিনেশন/মনোনয়ন বাণিজ্য, কালো টাকা, সন্ত্রাস ও পেশীশক্তির অপব্যবহার রোধে পিআর পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
নির্বাচনে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সকল দলের জন্য সমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গুরুত্ব পেয়েছে স্থানীয় নির্বাচন, ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়গুলোও। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী ও দুর্নীতিবাজদের বিচার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জরুরি সংস্কারের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
জামায়াতের জাতীয় সমাবেশে ফ্যাসিবাদ-মুক্ত বাংলাদেশে নব্য-ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজী, দখলবাজীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বলা হয়, কোনো কোনো দল ফ্যাসিবাদী মানসিকতা ধারণ করছে এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদ আবার শক্তি সঞ্চয় করছে। এক্ষেত্রে কোনো দলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না, কোন দলের প্রতি এই ইঙ্গিত করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমি বলব আরেকটা লড়াই হবে ইনশাআল্লাহ। একটা লড়াই হবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, আরেকটা লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে’।বাংলাদেশের পোশাক
এসব রাজনৈতিক ইস্যুর বাইরে মতাদর্শিক ঐক্যের আওয়াজও শোনা গিয়েছে জাতীয় সমাবেশের মঞ্চ থেকে। এতে প্রাধান্য পেয়েছে ইসলামী বিপ্লব, তৌহিদী জনতার বিজয়, কোরআনের আইন কায়েমের আকাঙ্ক্ষা। মোটা দাগে, জামায়াতের উদ্যোগে ইসলামপন্থী-গণতান্ত্রিক শক্তির রাজনৈতিক আশাগুলোকে একত্রিত পরিসরে উচ্চকিত করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তাছাড়া, জামায়াতের সঙ্গে অপরাপর ইসলামিক দল ও গ্রুপের যে বিরোধ ও দূরত্ব ছিল বলে মনে করা হয়, জাতীয় সমাবেশের মাধ্যমে সেটা ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, মতাদর্শিক অবস্থানে, রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক নৈকট্যে এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ে ইসলামপন্থী ও মধ্যপন্থী কিছু দল যে জামায়াতের সঙ্গে একমত ও ঐক্য প্রয়াসী, তা প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষত, জুলাই বিপ্লবের শক্তিগুলো যে জামায়াতকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে রাজী আছে, তেমন বার্তাও প্রকাশ পেয়েছে।
অনেক আগেই, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি সমমনাদের নিয়ে এমন একটি জাতীয় সমাবেশের আয়োজন অবশ্যই করতে পারত। এতে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির লাগাম দলটির হাতেই থাকত। বিএনপি হতে পারত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী দল ও শক্তিসমূহের অগ্রণী মুখপাত্র বা ভ্যানগার্ড।
জাতীয় সমাবেশে আনুষ্ঠানিক মেরুকরণের ইঙ্গিত প্রকাশ পাওয়ার আগেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বিভিন্ন ইস্যুতে উভয় দলের নেতৃবৃন্দকে বাকযুদ্ধে ও বিষোদগারে লিপ্ত হতেও দেখা গিয়েছে। জামায়াতের সমাবেশে অংশ নেওয়া বেশ কিছু নতুন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষও হয়েছে। ফলে এই নতুন মেরুকরণের ফলে সামনের দিনে রাজনীতিতে দুটি প্রবণসতা স্পষ্ট হতে পারে:
এক) উভয়ের পক্ষের মধ্যে আরো উত্তেজনা ও বিভেদ বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজনীতি আরো সংঘাতময় হওয়া;বাংলাদেশের পোশাক
দুই) একটি নিয়মতান্ত্রিক দ্বিদলীয় ব্যবস্থার দিকে দুটি দল ও তাদের সহযোগীদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সূচনা হওয়া।
বাস্তবে পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়। বিএনপির প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপের উপর বহুলাংশে নির্ভর করছে আগামীর রাজনৈতিক পরিস্থিতি। বিএনপি যদি কৌশলপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কাউন্টার পোলারাইজেশন বা পাল্টা মেরুকরণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করবে। আর যদি উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যে উভয় পক্ষই আবর্তিত হয়, তাহলে পরিস্থিতির অবনতি অবশ্যম্ভাবী, যা থেকে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রাপথ বিঘ্নিত হবে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সকলের জন্যই ধৈর্য্য, সহনশীলতা, দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণার পন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়। যেকোনো উত্তেজনা ও হঠকারিতা কেবল বাংলাদেশের সংকুল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও অনিশ্চিত করবে না, বরং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে।
লেখক, চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
কমেন্ট বক্স