২৩ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাংলাদেশের বার্ন সংকট – একটি জাতির ভঙ্গুর আশার শিখা

আপলোড সময় : ০৮-০৮-২০২৫ ১১:২১:০০ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশের বার্ন সংকট – একটি জাতির ভঙ্গুর আশার শিখা
বার্ন ইনজুরি বা দগ্ধ হওয়া শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রমাগুলোর একটি। অথচ ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের বাংলাদেশে বার্ন চিকিৎসা এখনও অত্যন্ত কেন্দ্রীয়ভিত্তিক, তীব্রভাবে অবহেলিত এবং ভয়ানকভাবে অপর্যাপ্ত। প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ বা শিল্প দুর্ঘটনার আড়ালে রয়েছে আরেকটি ধীরে-চলমান বিপর্যয়—সারাদেশে একটি কার্যকর জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং বিশেষায়িত বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমাহীন অভাব। এই নীরব ব্যর্থতা ইতোমধ্যে হাজার হাজার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, এবং যদি এখনই জরুরি সংস্কার না হয়, তাহলে আরও বহু মানুষ অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতার শিকার হবে।বাংলাদেশের পোশাক


Pause

Mute
Remaining Time -9:10
Unibots.com

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উচ্চ বার্ন আঘাতপ্রাপ্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ দগ্ধ বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত হন। এর মধ্যে ২৭ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় এবং প্রায় ৫,৬০০ মানুষ মারা যান। শিশু ও কিশোররা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ; প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার শিশু দগ্ধ হয়। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ—এই সংখ্যাগুলো বার্ন ইনজুরির সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় এবং বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের দুঃসহ জীবনের একটি ক্ষুদ্র চিত্র মাত্র।

দেশের বার্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাটি একটি মাত্র কেন্দ্রে নির্ভরশীল: ঢাকা শহরের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম বার্ন হাসপাতাল হলেও, একটি জাতির একমাত্র রেফারেল সেন্টার হিসেবে এর ওপর যে চাপ, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং বিপজ্জনক। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া বেইলি রোড অগ্নিকাণ্ডের সময় এই হাসপাতাল চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশে আর কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ বা তৃতীয় স্তরের হাসপাতালেই বার্ন ইউনিট নেই, যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীদের ঢাকা পর্যন্ত পাড়ি দিতে হয়। অনেকে পথেই মারা যান, আবার কেউবা পৌঁছানোর পরপরই চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ হারান।

এই দুর্বলতার মূল কারণ হলো, একটি জাতীয় জরুরি চিকিৎসা সেবাব্যবস্থা কখনও গড়ে না তোলা। যদিও ২০১৭ সালে সরকার ৯৯৯ হেল্পলাইন চালু করেছিল, কিন্তু এর পেছনে থাকা অবকাঠামো এখনও ভঙ্গুর এবং সমন্বয়হীন। অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই, চিকিৎসা সহায়ক কর্মী নেই, নেই যথাযথ সংযোগ বা যোগাযোগব্যবস্থা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় মাত্র ১৯ শতাংশ জরুরি রোগী অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে পৌঁছান—বাকি সবাই রিকশা, বাস, এমনকি পায়ে হেঁটে আসে, যার ফলে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি হয়। জরুরি কলের পর হাসপাতালে পৌঁছাতে গড়ে ৮০ মিনিটেরও বেশি সময় লাগে, যা “গোল্ডেন আওয়ার”-এর চেয়ে অনেক বেশি দেরি।বাংলাদেশের পোশাক

এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দুরদর্শিতার ঘাটতি। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা মূলত অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক—সড়ক, সেতু, দালান-কোঠা—কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষত ট্রমা কেয়ার ও জরুরি সেবাকে বরাবরই অবহেলা করা হয়েছে। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা বিপর্যয়, যেখানে ১১০০-র বেশি মানুষ নিহত হন, সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার পরও সরকার একটি সমন্বিত জাতীয় জরুরি চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন এবং জরুরি প্রস্তুতিতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি আজকের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই উদাসীনতার পরিণাম ভয়াবহ। প্রতিবছর হাজার হাজার দগ্ধ রোগী চিকিৎসা না পেয়েই মারা যান। আরও অনেকে হাসপাতালে পৌঁছান অনেক দেরিতে, যখন কার্যকর চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও করুণ—তারা দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকে, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয় এবং অনেক সময় চিরতরে পঙ্গু হয়ে পড়ে। দেশের গ্রামাঞ্চলে বার্ন ইনজুরির সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতা এখনও ভয়ংকরভাবে কম, ফলে মানুষ ক্ষতস্থানে টুথপেস্ট, সরিষার তেল বা গোবর লাগানোর মতো ক্ষতিকর পদ্ধতি প্রয়োগ করে।

এই অবস্থার পরিবর্তনে এখন একটি জাতীয় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকল্প জরুরি। বার্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢাকা-কেন্দ্রিকতা থেকে বের করে প্রতিটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি করে বার্ন ইউনিট চালু করতে হবে, যেখানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, অ্যানেসথেটিস্ট, পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ এবং ইনটেনসিভ কেয়ার সুবিধা থাকবে। একই সঙ্গে, সারাদেশে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক, সুসজ্জিত অ্যাম্বুলেন্স, রিয়েল টাইম কমিউনিকেশন সিস্টেম এবং জাতীয় ট্রমা ও দুর্যোগ চিকিৎসা প্রটোকলসহ একটি সমন্বিত জরুরি চিকিৎসা সেবা (EMS) গড়ে তুলতে হবে। জরুরি চিকিৎসাকে জনস্বাস্থ্যখাতে একটি স্বীকৃত শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যার জন্য বরাদ্দ থাকবে পৃথক বাজেট এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণব্যবস্থা।বাংলাদেশের পোশাক

এই সংকট শুধু সরকারের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এনজিও, কর্পোরেট ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সম্পৃক্ত করে একটি সক্রিয় পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের দায়িত্ব স্বীকার করে এগিয়ে আসতে হবে।

শেষ পর্যন্ত এটি শুধুই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর প্রশ্ন নয়—এটি মানবিকতা, ন্যায্যতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। বাংলাদেশ আর কতদিন বার্ন রোগীদের অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুতে শোক জানাবে অথচ মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাবে? একটি আধুনিক, মানবিক রাষ্ট্র বার্ন চিকিৎসা ও জরুরি সেবাকে বিলাসিতা নয়, বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। প্রতিটি মিনিট দেরি, প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের ব্যর্থতার প্রমাণ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচিতে এই সংকট মোকাবেলার জন্য একটি দৃঢ় অঙ্গীকার করা হয়েছে—যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সারাদেশে জরুরি চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। যদি আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি যে প্রতিটি জীবন মূল্যবান, তবে আমাদের এখনই একটি সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে—যা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে দ্রুত, ন্যায়সঙ্গত এবং সর্বত্র।


লেখক- উপদেষ্টা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি); সাবেক সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ, বিশ্বব্যাংক


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ