ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের এক বছরেরও বেশি সময় পর হঠাৎ করে কেন জাতীয় পার্টিকে 'শেখ হাসিনার দোসর' বলে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে? তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান।
তিনি দাবি করেন, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার এই দাবি পরিকল্পিত এবং এটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার একটি অংশ। বিশেষ করে গণঅধিকার পরিষদ এবং জামায়াতে ইসলামী এই দাবির পেছনে সক্রিয়।
রোববার (৩১ আগস্ট) নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণমূলক ভিডিওতে তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরেন।
"এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেলকেও আমরা একই রকম আলাপ করতে দেখছি। আওয়ামী লীগ যখন নিষিদ্ধ হচ্ছে তখন একই প্যাকেজে জাতীয় পার্টিসহ আরও যারা আছে ১৪ দলের, তাদের সবাইকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা না করে কেন হঠাৎ করে কিছু মানুষের এটা মনে হতে শুরু করল দলটিকে নিষিদ্ধ করতে হবে? তখনই একসাথে শেষ করে ফেলার চেষ্টা করা উচিত ছিল না?", প্রশ্ন রাখেন ডা. জাহেদ।
রাজনৈতিক এই বিশ্লেষক বলেন, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি সেটাকে কেন্দ্র করে দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। সামনের দিনগুলোতে এই ব্যাপারটা নানা দিকে নানাভাবে ডাইমেনশন তৈরি করতে পারে। গতকালই খুবই ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা ঘটেছে, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ হয়েছে। আমি এটাকে ভয়ঙ্কর ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই এবং খুব দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানাই।
"এর আগেও নিউজ দেখলাম, যখন জাতীয় পার্টির নিষিদ্ধতাকে কেন্দ্র করে নুরুল হক নূর আহত হলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে এবং বেশ কয়েকটা জায়গায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অথচ কথা ছিল এসব জায়গায় সরকারি নিরাপত্তা বাড়বে, কারণ এগুলো ঝুঁকির মধ্যে ছিল — এটা খুব সহজ অঙ্ক। তারপর তো গতকাল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লোকজন গিয়ে সেখানে ভাঙচুর করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে। আমরা আগের দিন আইএসপিআরের যে স্টেটমেন্ট ছিল নুরুল হক নূরের আহত হওয়া নিয়ে, সেখানে বলা হয়েছিল তারা সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মব কন্ট্রোলের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু এখন আমি যদি প্রশ্ন করি, পরশুর ঘটনার পর গতকাল জাতীয় পার্টির অফিসের নিরাপত্তা কয়েকগুণ বাড়ানোর কথা ছিল, উচিত ছিল করা হয়নি। ভাঙচুর হলো, অগ্নিসংযোগ হলো।"
আরও স্পষ্টভাবে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির অফিসে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ সেটা ঢাকার বাইরে বা ঢাকায় যাই হোক না কেন এটা গর্হিত কাজ হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ সংগঠন হবে না, ততদিন পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ড চলবে। এমনকি নিষিদ্ধ হলেও, যদি নিষিদ্ধ হয় কাগজে-কলমে, তার অফিসে গিয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে বলছি কথাগুলো— একটা রাষ্ট্র আইন দিয়ে চলবে, আইন ভেঙে কেউ চলবে না।
"জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় সহযোগী (কলাবোরেটর) হিসেবে আমি নিজেও মনে করি। কিন্তু তাকে নিষিদ্ধ করা হবে কিনা, নিষিদ্ধ কিভাবে হবে — নিষিদ্ধ হওয়ার আগে আমরা যা যা করছি, এমনকি নুরুল হক নূরদের পার্টি গণঅধিকার পরিষদ সেখানে মিছিল করে যে প্ররোচিত করেছেন সেটারও বিরোধিতা করি। ঠিক একইভাবে এই ভাঙচুর তো বটেই, আমরা কেউ এ কাজ করতে পারি না, কিন্তু করা হলো। করতে দেওয়া হলো", বলেন ডা. জাহেদ।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে নিষিদ্ধ করার জন্য গণঅধিকার পরিষদ এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীও এই দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছে।
সমকালের একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তিনি বলেন, জামায়াতসহ কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার পর তারা বিএনপিকে চাপ দেওয়ার জন্য বা নির্বাচন বানচালের জন্য জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
"এখানে বলা হচ্ছে, জামায়াত তার সাথে আরো ছয় দল একত্র হয়েছে। মানে বিএনপির সাথে বসার আগে জামায়াত বসেছে কার কার সাথে? ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি এবং খেলাফত মজলিস। তারা একসাথে তাদের চিন্তার কথা শেয়ার করেছে, তারপর সেটা নিয়ে বিএনপির কাছে গেছে এবং এটা যে শুধু জুলাই সনদ নিয়ে আলাপ হয়েছে আমার কাছে তাও মনে হয় না।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ হয়তো একটা সামনে রাখা ব্যাপার, কিন্তু নির্বাচন কেমন হবে? সেটা ভাগাভাগি কেমন হবে? কারণ বিএনপি যেহেতু একটা জাতীয় সরকার করবে বলছে, সে যখন সরকার গঠন করবে তাতে বিভিন্ন দলের লোকজনকে মন্ত্রী হিসেবে নেবে। তাই যদি হয় তাহলে একটা জাতীয় সংসদ কেন হচ্ছে না? মানে সব দলকে ছেড়ে দিয়ে বিএনপি — এমনকি সংখ্যাটা বলা হয়েছে ২০০-এর নিচে থাকবে। বাকি ১০০ সিট বিভিন্ন দলকে— জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ আরো যারা আছে— তাদেরকে দেবে। বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গীরা ২০০ আসনের নিচে থাকবেন যাতে তারা সংবিধান সংশোধন জাতীয় কাজ করতে না পারেন। এই ধরনের একটা আলাপ আছে। সুতরাং এই আলাপটাও হয়তো আলোচনা হয়েছে এবং সেটা যখন বিফল হয়েছে।
"এখন হঠাৎ করে কেন মনে হলো জাতীয় পার্টি তো অপরাধী? হঠাৎ করে কেন মনে হলো?— কারণ হচ্ছে, এটা এখন যদি তারা বিএনপির উপরে চাপ তৈরি করতে পারে। বিএনপির উপরে চাপ তৈরি করাটাই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে। অথবা নির্বাচন যদি তারা বানচালই করে ফেলতে চায়। বিএনপির উপরে চাপ তৈরি করা যাতে বিএনপি তাদের জুলাই সনদ হোক বা তাদের সাথে সিট ভাগাভাগি করে। জামায়াত যদি দেখে বিএনপির সাথে আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে মোটামুটি সম্মানজনক একটা সিট তারা পেতে পারে, এনসিপি-ইসলামী আন্দোলন যদি মনে করে এসব সংস্কার বিচার হবে না, আইনশৃঙ্খলা ভালো না, সংসদের নিম্নকক্ষে প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন— এসব সব ঝামেলা চুকে যাবে, কোন সন্দেহ নেই।"
ডা. জাহেদ বলেন, তো জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং নিষিদ্ধ করার জন্য তাদের যে যাবতীয় কর্মকাণ্ড সেটা গণঅধিকার পরিষদ সেই কাজে নেমেছেন, তাদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে। এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে এবং এই ঘটনা ঘটার পরই দেখলাম জামায়াতে ইসলামী এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যাপারে তাদের মতামত জানিয়েছে যে তারা নিষিদ্ধতা চায়। আর যদি বিএনপি একমত না হয় তাহলে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। কারণ এটা ফ্যাক্ট, যে দলগুলোর নাম পড়লাম এরা যদি নির্বাচনে না যায় তাহলে এর মধ্যে ছোট দল আছে কিন্তু তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা থাকার কারণে এই দলগুলো মানুষের কাছে পরিচিত। সুতরাং তারা যদি না যান তাহলে যেটা দাঁড়াবে সেটা হলো— নির্বাচন তখন হবে কিনা আদৌ এই প্রশ্ন এসে হাজির হবে। কারণ তখন কিভাবে আসলে নির্বাচন হবে? জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে সেই পথটা তারা তৈরি করে রাখছে। সুতরাং দেশকে পরিকল্পিতভাবে একটা এনার্কির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারত ও আওয়ামী লীগ ড. ইউনূসের সরকারের চেয়ে একটি নির্বাচিত সরকার পছন্দ করে। তবে তারা সবচেয়ে বেশি খুশি হবে যদি বাংলাদেশে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই নৈরাজ্যের ফলে বাইরের শক্তিগুলো বাংলাদেশে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।
"বাংলাদেশ একটা নৈরাজ্যের মধ্যে ঢুকে যায়, বাংলাদেশে একটা ক্যাওস শুরু হয়। সে ক্যাওস চলতে চলতে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছে যাব— তখন এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ঢুকে আরো অনেক কিছু করে ফেলতে পারবে। ভারতীয় 'র'–এর এজেন্টরা ঢুকে অনেক কিছু করে ফেলতে পারবে। আমরা কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে বা কেউ পরিকল্পনার অংশ হয়ে আসলে এই পরিকল্পনাটাকেই বাস্তবায়ন করার জন্য মাঠে নামা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কোনোভাবে যদি অনিশ্চিত করার পরিস্থিতি তৈরি হয়— চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি, বাংলাদেশ খুবই দীর্ঘমেয়াদী একটা এনার্কির মধ্যে ঢুকবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। কেউ কেউ বলছেন একটা গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
"এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে অথবা এমন কিছু হবে যে আমাদের গণতান্ত্রিক রূপান্তর অনেক দূরে চলে যাবে। আমাদের জনগণের এই খেলার প্রতি সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।"