জুলাই অভ্যুত্থান
একুশ শতকের রাজনৈতিক প্রতিরোধের মডেল
আপলোড সময় :
০৮-০৮-২০২৫ ১১:১৫:৩৩ পূর্বাহ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলার বর্ষা ঋতু ভারী বৃষ্টিতে ঢাকার রাস্তাগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আকাশের সমান্তরালে মাটিতে তখন আরেক ধরনের ঝড় তৈরি হচ্ছিল। একটি ছোট্ট বিক্ষোভ থেকে একটি গণআন্দোলনের ঝড় ক্রমশ ধেয়ে আসছিল সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আর এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল প্রচণ্ড দ্রোহ, ক্ষোভ আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আমূল বদলে দেওয়ার স্পৃহায় ভরপুর অভ্যুত্থানের শক্তিমত্তা।বাংলাদেশের পোশাক
Pause
Mute
Remaining Time -13:21
Unibots.com
সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরোধিতা, বিশেষত কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়েই এক গণবিপ্লবে পরিণত হয় অনেকগুলো কারণে। যার মধ্যে যেমন ছিল আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, তেমনিভাবে ছিল আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগ ও ভুল পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক আকারের গণবিস্ফোরণ। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো জুলাই ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে নীরব ও নিষ্ক্রিয় ছিল, এমনটা হলফ করে বলা যাবে না। সবকিছুর সম্মিলিত ফলাফল হলো এই যে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে চরম নাটকীয়তায় ভরা টানটান উত্তেজনাকর ঘটনাবলির মাধ্যমে।
এক বছর পরে উল্লেখযোগ্য এক গবেষণা, বই ও বিশ্লেষণে উঠে আসছে—এই আন্দোলনের সাফল্য কীভাবে সম্ভব হলো এবং কেন এটি ব্যতিক্রমী ছিল। বিশ্লেষণ বলছে, এই ছাত্র আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি নতুন ধারা, যা তরুণদের নেতৃত্ব, ডিজিটাল প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে। গবেষক ও বিশ্লেষকরা এখন এটিকে একুশ শতকের রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক মডেল হিসেবে দেখছেন।
অতীত থেকে শিক্ষা, ভবিষ্যতের জন্য কৌশল
সাংবাদিক ও গবেষক অনুপম দেবাশীষ রায়ের লেখা ‘বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব’ বইটিতে ২০১৮ সালের ব্যর্থ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও ২০২৪ সালের সফল ছাত্র অভ্যুত্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে। তার মতে, এই আন্দোলনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল স্মার্ট কৌশল, স্পষ্ট ভাষা, এবং সামাজিক মাধ্যমে সুসংগঠিত প্রচার। যখন এক মন্ত্রী ছাত্রদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যা দেন, তখন তা আন্দোলনের জন্য পরিণত হয় একটি নৈতিক যুদ্ধঘোষণায়। ছাত্ররা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকারকে নৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে।
জুলাই আন্দোলন নিয়ে রচিত প্রথম বই (আগস্ট ২০২৪, ঢাকা: স্টুডেন্ট ওয়েজে), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজের ‘Student Protest and Hasina's Downfall in Bangladesh’ এই আন্দোলনকে একটি শাসনের পতনের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বহু বছর ধরে জনগণের বিরোধিতা সহ্য করে টিকে ছিল, কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া আন্দোলন থামানোর কৌশলপূর্ণ দক্ষতা সরকার দেখাতে পারেনি এবং শাসনের প্রশ্নবিদ্ধ বৈধতাকে ধরে রাখার রাজনৈতিক ও নৈতিক সামর্থ্যও প্রমাণ করতে পারেনি। দীর্ঘ বছরের শাসনকালে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার অবক্ষয়ের মাধ্যমে সরকার নিজেই যে নিজের শক্তির ক্ষয় ঘটিয়েছে, সর্বাত্মক পতনের মাধ্যমে সেটাই দৃশ্যমান হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের প্রতিরোধ
২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র আন্দোলন আরো একটি ব্যতিক্রমী বিষয় সামনে আনে ‘ডিজিটাল প্রতিরোধ’। ‘Harnessing Facebook by Gen Z to Mobilize Masses’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা যায়, কীভাবে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছাত্রদের আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এবং সরকারকে ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হয়। সরাসরি কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব ছাড়াই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত।
অন্যদিকে, ‘Monsoon Uprising in Bangladesh’ নামের গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয় কীভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভাষা ও প্রতীক ছাত্ররা ব্যবহার করে নিজেদের আন্দোলনকে একটি নৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। এই প্রতীক ও ভাষা আন্দোলনের একটি সমষ্টিগত পরিচয় তৈরি করে, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং সরকারবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দেয়।
শুধু একটি আন্দোলন নয়, একটি যুগান্তকারী রূপান্তর
২০২৪ সালের এই ছাত্র অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। এটি ছিল কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের সংগঠিত সচেতন প্রয়াস। হাতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড, কাঁধে ইতিহাসের ভার এবং হাতে থাকা স্মার্টফোনই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র।
গবেষকেরা বলছেন, এই আন্দোলন হংকংয়ের “আম্ব্রেলা মুভমেন্ট”, আরব বসন্ত কিংবা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু আন্দোলনের মতোই এক বৈশ্বিক ধারার অংশ। কিন্তু এর কৌশল, ভাষা ও নেতৃত্ব ছিল পুরোপুরি দেশীয় ও স্বকীয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নতুন প্রজন্ম শুধু রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়, তারা রাজনৈতিকভাবে সক্ষম এবং তারা আর ভয় পায় না। রাষ্ট্র যতোই শক্তিশালী হোক, ইতিহাস ও হ্যাশট্যাগের শক্তি একসাথে থাকলে প্রতিরোধ থামানো যায় না। তবে তাদের সামনের দিনগুলো নিয়ে রয়েছে দ্বিধা। মূলস্রোতের গতানুগতিক রাজনীতির সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফলে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে আমরা এখনও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি—কীভাবে তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা হবে? ডিজিটাল আন্দোলন কীভাবে টেকসই সংস্কারে রূপান্তর হবে? আন্দোলন বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আসতে কতটুকু সফল হবে কিংবা সামনের দিনগুলোতে বিচ্যুতি এড়িয়ে কতটুকু শুদ্ধতার সাথে চলমান থাকতে পারবে? এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বিবেচনায় রেখেও এক বছরের স্মৃতিতে একটি বিষয় নিশ্চিতই বলা যায়-২০২৪ সালের বর্ষার ছাত্র অভ্যুত্থান আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তন আসতে পারে হঠাৎ করেই—বিশেষত যখন ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং নৈতিক সাহস এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন পরিস্থিতি নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের পথে চলতে থাকে, ক্ষমতা বা শক্তির দাপট সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ ধরনের আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক মডেল, যদিও সামগ্রিক সাফল্য আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ও অর্জনের নিরিখে ভবিষ্যতের ইতিহাস নির্ধারণ করবে।বাংলাদেশের পোশাক
লেখক: চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
কমেন্ট বক্স