কে ছিলেন সাইয়্যেদ সালমান নদভী ? (সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম)
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
মাওলানা সাইয়েদ সালমান হোসাইনী নদভী রহ.। ভারতের প্রখ্যাত আলেম স্কলার। গোটা দুনিয়ায় ছিল তাঁর পরিচিতি। আরব বিশ্বেতিার লেখা ও বয়ান তুমূল জনপ্রিয় ছিল। তিনি ছিলেন মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর নিকটাত্মীয় ও জানেশিন ছিলেন এবং হাতে গড়া শিষ্য। চিন্তা-চেতনার একনিষ্ঠ ধারক। আলী মিয়া নদভীর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মনে করা হতো তাঁকে। নদওয়ার তুমুল জনপ্রিয় উস্তাদ ছিলেন। আজ তিনি দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করেছেন।
মুসলিম বিশ্বের জনপ্রিয় এই কন্ঠস্বর, উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার, বহু গ্রন্থপ্রণেতা মাওলানা সৈয়দ সালমান হুসাইনি নদভী আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) ভারতের লখনৌয়ের একটি হাসপতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যুবরণ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭২ বছর।
মুফতী সালমান নদভী রহঃ এর শেষ সময়ে যেমন হয়েছিল ।
তিনি গতকাল রাতে এশার নামাজ শেষ করে রাতের খানাপিনা শেষে ঘুমিয়ে গেলেন পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ, তাজবিহাত , এবং ব্যক্তিগত মামুলাত শেষ করলেন, হঠাৎ করে বুকের মধ্যে ব্যথা অনুভব হতে শুরু হল , মাত্র ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই মাহবুবে এলাহির মেহমান হয়ে গেলেন ।
তার বয়ান ও আলোচনা শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল। সমসাময়িক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে মাওলানা নদভী তার সাহসী ও স্পষ্টভাষী মতামতের জন্য পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে আলোচিত হতো। বরেণ্য এই আলেমের মৃত্যুতে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তাঁর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মাওলানা সালমান নদভী ১৯৫৪ সালে লখনৌর এক ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশপরম্পরা সরাসরি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। লখনৌর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে কোরআনে হাফেজ হওয়ার মাধ্যমে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। ১৯৭৪ সালে তিনি নদওয়াতুল উলামা থেকে স্নাতক এবং ১৯৭৬ সালে হাদিস শাস্ত্রে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান এবং ১৯৮০ সালে প্রখ্যাত আলেম শেখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানে হাদিস গবেষণায় পুনরায় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।তিনি ১৯৮০ সালে উচ্চ স্বীকৃতির সাথে হাদিস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ জামউ আলফাজুল-জারহ ওয়া'ল-তা'দিল ওয়া দিরাসাতুহা মিন কিতাব তাহদীব আল-তাহদীব লি'ল-হাফিজ ইবনে হাজার আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।
সৌদি আরব থেকে ফিরে মাওলানা নদভী দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক প্রতিষ্ঠানটির ‘দাওয়াহ ও শরিয়াহ’ অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি আরবি ও উর্দুতে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। মাওলানা সালমান নদভির বর্ণাঢ্য জীবনে (১৯৫৪- ২০২৬ ইং) এমন কিছু কাজ করে গিয়েছেন, যা তাকে হাজার বছর পৃথিবীবাসীর কাছে স্মরণীয় করে রাখবে। আমার মতে, তার জীবনের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, আলি মিয়া নদভি রহ.-এর ফিকরি মিশনের সহযোগিতা। আলি মিয়া নদভি রহ.-এর এমন অনেক কাজ নদভি রহ.-এর নামে পরিচিত; অথচ সেগুলোর আরবি রূপান্তর করেছেন শায়খ সালমান নদভি রহ.। যেমন:
১- রিজালুল ফিকরি ওয়াদ দাওয়াহ (৩য় ও ৪র্থ খণ্ড)
২- ফী মাসিরাতিল হায়াত (১ম ও ২য় খণ্ড)
তার আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের নমুনা:
১- আখেরি ওহি। উর্দু দুই খণ্ডের তাফসিরে কুরআন। এই তাফসিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো: আয়াতের মোনাসাবাত ব্যক্ত করা, কুরআনের তারতিবে নুযুলি উল্লেখ করা, ফাহমে কুরআন ও শাব্দিক ইজাযের পরতে পরতে তাদাব্বুরে কুরআনের অনন্য সৃষ্টি। সংক্ষিপ্ত তাফসির হিসেবে এই কিতাবের নযির মেলা ভার।
২- মিশআলুল মাসাবীহ আলা মিশকাতিল মাসাবীহ (১৫ খণ্ড)। মেশকাত শরিফের শাব্দিক ও হাদিসি উসলুবে এই গ্রন্থ তাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে নিশ্চয়ই।
৩- আলফাযুল জারহি ওয়াত তাদিল (৪ খণ্ড)।
৪- মাশায়েখুল ইমাম বুখারী।
৫- আল মাদখাল ইলা দিরাসাতি জামে তিরমিযি।
৬- আল ইমাম ওয়ালি উল্লাহ আদ দেহলাভি।
৭- ইয়াহুদি খবাসাতেঁ।
৮- আমারা নেসাবে তালিম কিয়া হোঁ?
৯- দ্বীনি মাদারেস কা নেযামে তালিম।
১০- খুতুবাতে বেঙ্গলোর।
১১- মুযাক্কিরাতী (২৪ খণ্ড)।
১২- অসংখ্য দরসি কিতাবের তাহযিব ও তাহকিক।
লখনৌতে অবস্থিত দারুল-উলূম নদওয়াতুল উলামায় তিনি দাওয়াহ অনুষদের ডিন ও শায়খুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৫ সালে মাদ্রাসা আল-ইমাম আহমদ ইবনে ইরফান আল-শাহিদ আল-ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন।
মাওলানা নদভী কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন উঁচুমাপের গবেষক ও সংগঠক। আরবি ও উর্দু ভাষায় ইসলামি আকিদা, ইতিহাস ও হাদিস শাস্ত্রের ওপর তার রচিত অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ‘জামিয়াত শাবাবুল ইসলাম’ নামক যুব সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।১৯৭৪ সালে স্নাতক শেষ করার পর তিনি অন্যান্য স্নাতকদের একটি দলের সাথে একত্রে জামিয়াত শাবাব আল-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সক্রিয় ইসলামী সংগঠনগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।
এছাড়াও ড. আব্দুল আলী ইউনানি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং দারুল উলুম সৈয়দ আহমদ শহীদ-এর চ্যান্সেলর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
সমসাময়িক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে মাওলানা নদভী তার সাহসী ও স্পষ্টভাষী মতামতের জন্য পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে আলোচিত হতো। বরেণ্য এই আলেমের মৃত্যুতে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তাঁর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মাওলানা সালমান নদভী ছিলেন বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, বিশিষ্ট লেখক, কোরআনের মুফাসসির এবং প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে মুসলিম বিশ্বে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার বয়ান ও আলোচনা শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল।
মাওলানা সালমান নদভী ছিলেন বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, বিশিষ্ট লেখক, কোরআনের মুফাসসির এবং প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে মুসলিম বিশ্বে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার বয়ান ও আলোচনা শুধু ভারতেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল।
সারা জীবন তিনি ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। শিক্ষা, দাওয়াহ, গবেষণা, লেখালেখি ও জনসচেতনতামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইসলামী জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রাখেন। ইসলামী সাহিত্য ও জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে তার লেখা অসংখ্য গ্রন্থ ও প্রবন্ধ দীর্ঘদিন ধরে পাঠক ও গবেষকদের জন্য মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি বহু সম্মেলন, সেমিনার ও গবেষণা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ইসলামী চিন্তা ও আন্তধর্মীয় বোঝাপড়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার গভীর জ্ঞান, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য তাকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আলেম সমাজের কাছেও বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
সালমান হোসাইনী নদভী সাহেব বেশ কয়েক বার বাংলাদেশে এসেছেন। কাছে তাঁকে দেখেছি, সান্নিধ্যে গিয়েছি। চেহারায় যেন নূর টপকে পড়তো। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। তাঁর আরবি ও উর্দু বক্তৃতার একজন ভক্ত ছিলাম আমি। ইউটিউবে তাঁর প্রচুর বক্তব্য শুনেছি। অনেক বক্তব্য অনুবাদ করে মাসিক দ্বীনী দাওয়াত পত্রিকায় ছেপেছি ।
তিনি বহুভাষি, বিভিন্ন বিষয়ে গভীর পান্ডিত, রাজনৈতিক অংগনে মুসলিমদের স্বার্থে অত্যন্ত সোচ্চার, এবং সারা বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আলিম হিসেবে বিবেচিত হতেন।
আমি অধম তার সান্নিধ্য পেয়েছি একাধিকবার, মুগ্ধ হয়েছি তার আরবি শুনে; আরবদের মধ্যে তাঁর মতো বাগ্মী আমাদের সময়ে খুব কম দেখেছি। উর্দু ভাষায় অমন করে বক্তৃতা কে আর করেছেন আমাদের সময়ে?!
মরহুমের জানাজার নামাজ সোমবার লখনউয়ের নিকটবর্তী মালিহাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মৃত্যুকালে তিনি পরিবার-পরিজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্র রেখে গেছেন।
তাঁর ইন্তেকালের খবরে দেশ-বিদেশের আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, ছাত্র এবং শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাঁর ইলমি অবদান, দাওয়াতি কর্মপ্রচেষ্টা এবং উম্মাহর জন্য রেখে যাওয়া অবিস্মরণীয় খেদমতের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন।
আল্লাহ তাঁর বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম নসিব করুন। আমিন।