ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নদী তীরবর্তী চরলাপাং এলাকায় বালু সন্ত্রাসীদের গুলিতে ১০ জন আহতের ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ মান্নান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বালুসন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) তিনি এই নির্দেশনা দিয়ে ফিরে আসার কয়েক ঘণ্টা পরই রাতে চরলাপাং গ্রামে আবারও বালুসন্ত্রাসীরা সশস্ত্র মহড়া দেয়। এসময় সন্ত্রাসীরা একাধিক ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এতে ভয়ে গ্রামের লোকজন ঘর থেকে বের হয়ে দৌড়ে অন্যত্র পালাতে থাকে।
চরলাপাং গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) জীবন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি সাহেব দুপুরে আমাদের গ্রামে সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে বালুসন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে ফিরে আসার কয়েক ঘণ্টা পরই রাত ১০টার দিকে বালুসন্ত্রাসীরা অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গ্রামে এসে ককটেল ফুটিয়ে মহড়া দেয়। এরপরই আমি নবীনগর থানায় এসে ওসিকে পুরো ঘটনা অবগত করি।’
এদিকে চরলাপাং গ্রামে বালু সন্ত্রাসীদের হামলায় ১০ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার তিন দিন পরও পুলিশ এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান ঘটনাস্থল চরলাপাং এলাকা পরিদর্শন করে সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে স্থানীয় পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দেন। এসময় ইউএনও মাহমুদুল হাসান, ওসি রফিকুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এলাকাবাসী জানান, গত রবিবার (২২ ফেব্রুযারি) সকালে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের নাসিরাবাদ বালু মহালের ইজারাদারের সশস্ত্র লোকজন ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে দূরবর্তী নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী চরলাপাং এলাকায় আবারও জোরপূর্বক মাটি কাটতে আসে। সেসময় গ্রামবাসী বাধা দেয়।
তারা আরো জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর ‘স্বর্ণমহল’ খ্যাত এই লাভজনকন বালু মহলটির ইজারা পান শ্যামগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন পায়েল।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারার শর্ত ভেঙ্গে শতাধিক ড্রেজারের (খননযন্ত্র) মাধ্যমে ইজারাদারের সশস্ত্র লোকজন নাসিরাবাদ থেকে দূরবর্তী চরলাপাং এলাকায় এসে গ্রামবাসীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জোরপূবর্ক অবৈধভাবে দিনেরাতে সমানে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী চরলাপাং গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলো প্রচন্ডভাবে ভয়াবহ নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপি নেতা পায়েল মুক্তার এই বালু মহালের ‘ইজারা’ পেলেও, এই বালু মহাল থেকে বিগত দিনে আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির দুই গ্রুপের প্রভাবশালী নেতা ও চরলাপাং এলাকার সাহেব সর্দারসহ প্রায় সব শ্রেণির প্রতিনিধিরাই ইজারাদারের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের ‘মাসোহারা’ পান। যার কারণে এর বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকায় বহু লেখালেখিসহ বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জনস্বার্থে বালুর এই ইজারা বাতিলের জোর দাবি জানানো হলেও, সেই দাবি রহস্যজনক কারণে কার্যকর হচ্ছে না।
চরলাপাং এলাকার বাসিন্দা ও নবীনগর পশ্চিম ইউপির চেয়ারম্যান নূর আলম এ অভিযোগ অনেকটা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার জানা মতে, এলাকার সাহেব সর্দারসহ অনেকেই ইজারার শুরুর দিকে ইজারাদারের কাছ থেকে মাসোহারা পেতেন। কিন্ত, গত দুই মাস ধরে মাসোহারা বন্ধ রয়েছে।’
আপনি (চেয়ারম্যান) সেই মাসোহারা নেন কি না? এ প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান নূর আলম সরাসরি ‘না’ সূচক জবাব দেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে বালু মহালের ইজারাদার শ্যামগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন পায়েলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও, তিনি কল রিসিভ করেননি।
নবীনগর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গোলাগুলির ঘটনার তিন দিন পরও থানায় এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। তবে ঘটনার পর থেকে পুলিশ হামলাকারী বালুসন্ত্রাসীদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে।’
তিনি জানান, যেকোনো পরিস্থিতি মোকবিলায় পুলিশকে আজ বুধবার ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।