২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

নেতৃত্ব লালসার বিষয় নয়, বরং এটি দায়িত্ব ও আমানত

ইসলাম ডেস্ক | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ১০-০২-২০২৬ ১১:৪২:২৮ পূর্বাহ্ন
নেতৃত্ব লালসার বিষয় নয়, বরং এটি দায়িত্ব ও আমানত

মানুষের সমাজজীবনে নেতৃত্ব একটি অপরিহার্য বিষয়। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই এমন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি দিকনির্দেশনা দেবেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করবেন। কিন্তু ইসলাম নেতৃত্বকে কখনো ক্ষমতা, মর্যাদা বা প্রাধান্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে একটি গুরুতর দায়িত্ব ও কঠিন আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। এ কারণেই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা বা ক্ষমতার প্রতি লালসাকে ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

 

 

আবূ মূসা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি ও তাঁর গোত্রের দুই ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসেন। তাদের একজন বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে কোনো বিষয়ে আমীর নিযুক্ত করুন।’ অন্যজনও একই আবেদন করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
“যারা নেতৃত্ব চায় এবং এর প্রতি লালায়িত হয়, আমরা তাদেরকে এ পদে নিয়োগ করি না।

 
”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৯)

 

এই হাদিস ইসলামের নেতৃত্ব-দর্শনের একটি মৌলিক নীতিকে স্পষ্ট করে। এখানে নেতৃত্বকে কোনো সম্মানসূচক পদ বা ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে নয়, বরং জনগণের অধিকার ও কল্যাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জবাবদিহিমূলক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে থেকে নেতৃত্ব কামনা করে, তার মধ্যে প্রায়ই ক্ষমতার আকর্ষণ, প্রভাব বিস্তারের ইচ্ছা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করতে পারে। আর এ ধরনের মানসিকতা নেতৃত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

 

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন আদর্শ নেতা সেই ব্যক্তি, যিনি দায়িত্বকে বোঝা মনে করেন, সুযোগ নয়; যিনি পদকে সম্মানের উৎস নয়, বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যার (রা.)-কে বলেছিলেন, “নেতৃত্ব একটি আমানত। কিয়ামতের দিন এটি লাঞ্ছনা ও অনুতাপের কারণ হবে, যদি কেউ এর হক আদায় করতে না পারে।” (সহিহ মুসলিম)

নেতৃত্বের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানুষকে নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে। তখন যোগ্যতার পরিবর্তে কৌশল, সেবা-মানসিকতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা এবং জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পায়।

 
এর ফলে সমাজে বিভাজন, অন্যায় ও অবিচার বৃদ্ধি পায়। ইসলাম এই প্রবণতার পথ রুদ্ধ করতে নেতৃত্বপ্রার্থীতাকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং যোগ্যতা, সততা ও আমানতদারিতাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

 

কোরআনেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শক্তি ও বিশ্বস্ততার সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। ইউসুফ (আ.) যখন দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলেন, তখন তিনি বলেন,
“নিশ্চয়ই আমি রক্ষণশীল ও জ্ঞানসম্পন্ন।” (সূরা ইউসুফ: ৫৫)

এ থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব গ্রহণই ইসলামের কাম্য।

বাস্তবতা হলো, যে ব্যক্তি নেতৃত্বের জন্য মরিয়া থাকে, সে প্রায়ই ক্ষমতার মর্যাদা দেখে; আর যে ব্যক্তি দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করে, সে নেতৃত্বকে সেবা ও ত্যাগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। ইসলামের শিক্ষা হলো, নেতৃত্ব চাওয়ার চেয়ে নিজেকে যোগ্য করে তোলা এবং আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ হওয়ার চেষ্টা করা।

সারকথা, নেতৃত্ব কোনো লালসার বিষয় নয়; এটি মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির এক কঠিন আমানত। যে সমাজে নেতৃত্বকে ক্ষমতার আসন নয়, বরং দায়িত্বের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়, সেই সমাজেই ন্যায়, স্থিতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ শিক্ষাই আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক গভীর ও চিরন্তন নির্দেশনা।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ