নির্বাচনী প্রচারণার চতুর্থ দিনে গতকাল রবিবার জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ, গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠ ও বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা মাঠে পৃথক সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। এসব সমাবেশে তিনি আগামী নির্বাচনের নানা অঙ্গীকার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি, তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না।
গতকাল যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজে সকাল ১১টায় ঢাকা-৪ ও ৫ আসনের সমাবেশ, দুপুর ২টায় ঢাকা-৬ আসনের আয়োজনে গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে এবং বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকা-৭ আসনের আয়োজনে বকশীবাজার ঢাকা আলিয়া মাদরাসা মাঠের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াত আমির।
কাজলায় সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি, কেউ কেউ নিজেদের হেরে যাওয়ার ভয়ে বাঁকা অন্ধকার গলিপথে চলতে পারেন। আমরা নির্দিষ্ট কোনো দলকে বলছি না, ব্যক্তিকেও বলছি না। আমরা আশা করব, জুলাইয়ের চেতনাকে উপলব্ধি করে এগুলো থেকে সরে আসবেন।
ক্ষমতায় গেলে বেকারদের কর্মোপযোগী করতে শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও আরবি যুক্ত করা হবে বলে জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘এ জন্য আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা থাকবে না। এটি সব জায়গায় করা হবে।
চাঁদাবাজি রুখতে অ্যাপ : চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করতে এবং মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জামায়াত দুটি অ্যাপ খুলেছে বলে জানিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আরেকটি অ্যাপে জনগণের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানানো যাবে। সেটি যথোপযুক্ত জায়গায় চলে যাবে। যার কাছে যাবে, তার দায়িত্ব হবে সেই সমস্যার সমাধান করা। আর জামায়াতের জনপ্রতিনিধিদের ছয় মাসে একবার জনগণের মুখোমুখি করা হবে।’
বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমির ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও ঢাকা-৫ আসনের প্রার্থী কামাল হোসেনের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন এবং তাঁদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে এলাকাবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির। সঞ্চালক ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানা জামায়াতের আমির এ কে আজাদ খান, কদমতলী থানার আমির মো. মহিউদ্দিন এবং মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শুরা সদস্য মিজানুর রহমান মালেক।
গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠের সমাবেশ : গতকাল দুপুরে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার ধূপখোলা মাঠে ঢাকা-৬ আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী ড. মুহাম্মদ আব্দুল মান্নানের নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা জাতিকে পথ দেখাবেন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, গত ৫৪ বছরে যারা পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে, তারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে পারেনি। ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সামাজিক দায়িত্বগুলো রাষ্ট্রকর্তৃক পালন করা হবে।’
ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর চলমান জুলুমের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবসায়ীদের কান্না শুনতে পাই। আমরা ওয়াদা করছি, আমরা ক্ষমতায় গেলে চাঁদা নেব না, কাউকে নিতেও দেব না। দুর্নীতি আমরা করব না, সহ্যও করব না। আমরা জামায়াতের বিজয় চাই না, আমরা মানুষের বিজয় চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তার দলের কোনো সম্পর্ক নেই! কারণ তারা আজকের পরিস্থিতি চায়নি, তারা চেয়েছে হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক।’
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম দেশবাসীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করে মোদির সেবাদাস দল ও নেতাদের বয়কট করার আহ্বান জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘যখন সংস্কার এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে তখন গণতান্ত্রিক পথে আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হবে। যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়, যারা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে চায়, যারা বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করতে চায়, তারাই সংস্কারের বিপক্ষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে চাইবে না।
আলিয়া মাদরাসা মাঠের সমাবেশ : ঢাকা-৭ আসনের আয়োজনে বকশীবাজার ঢাকা আলিয়া মাদরাসা মাঠের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদক, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র তাদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।’
আলিয়া মাদরাসা মাঠের সমাবেশে জামায়াত আমির ঢাকা-৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী হাফেজ এনায়েত উল্লাহর হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমরা শুধু নির্দিষ্ট কোনো দলের বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’
জামায়াত আমিরের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। গতকাল সকালে রাজধানীর জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। দুই পক্ষই আশা করে এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হবে।
সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান, হেড অব পলিটিক্যাল টিমোথি ডাকেট এবং সেকেন্ড সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) মিস কেট ওয়ার্ড। এ সময় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন এবং জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান।
ফ্রান্স রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে শার্লেট। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি রাষ্ট্রদূত ফ্রেদেরিক ইনজা ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জুলিয়েন ডিউর। জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. যুবায়ের আহমেদ এবং আমিরে জামায়াতের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান।
জামায়াত জানায়, সাক্ষাৎকারটি অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।