ভোট ও আমানতদারিতা: ইসলামের দৃষ্টিতে নাগরিক দায়িত্ব
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোটাধিকার পবিত্র আমানত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোটের এই গুরুত্বকে ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাস্তাঘাট নির্মাণ বা তুচ্ছ বৈষয়িক লাভের বিনিময়ে বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির মূলে রয়েছে নির্বাচনের এই ধর্মীয় আমানতদারিতার ক্ষেত্রে আমাদের চরম অবহেলা ও উদাসীনতা।
১. ভোটের প্রকৃত স্বরূপ ও গুরুত্ব
ভোটকে শুধু একটি পার্থিব বিষয় মনে করা মস্তবড় ভুল।
যদি কোনো জাতি এই আমানত ও দায়িত্ব পালনে অলসতা ও গাফিলতি প্রদর্শন করে, তবে দেশের কোনো স্তরই নিরাপদ থাকবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি ইসলামের মানদণ্ডে ভোট প্রয়োগ না করা হয়, তবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও বেকারত্ব দূরীকরণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। নির্বাচন কমিশনকে যেমন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ভোটারদেরও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে সচেতন হতে হবে।
নির্বাচনের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একনিষ্ঠ নেতৃত্ব নির্বাচন করা, যাঁরা দেশপ্রেমিক, পরহেজগার।
২. ভোটাধিকার ও মুসলিম উম্মাহর মাপকাঠি
একজন সচেতন মুসলমানের ভোট শুধু এমন প্রার্থীর জন্য হওয়া উচিত, যিনি নিয়মিত নামাজ-রোজা পালন করেন, মাদক ও সুদের মতো পাপাচার থেকে মুক্ত এবং যিনি জাতীয় সংসদে অমুসলিম বা বিজাতীয় আদর্শের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সচেষ্ট থাকবেন। যদি কোনো ক্ষেত্রে এমন যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে ভোট না দেওয়াই শ্রেয়। কারণ ভোট শুধু একটি সিল নয়, এটি একটি ‘শরয়ি সাক্ষ্য’। আর সাক্ষ্য প্রদানের জন্য শুধু বালেগ হওয়া যথেষ্ট নয়, বরং প্রার্থীর মধ্যে পরহেজগারিতা ও সত্যবাদিতার গুণ থাকা আবশ্যক।
৩. আমানত ও এর সঠিক প্রয়োগ
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’
পাকিস্তানের মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। যারা নিয়োগকর্তা বা ভোটার, তারা এই আমানতের আমিন বা রক্ষক। কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় পদে আসীন করা আল্লাহর সঙ্গে খিয়ানত করার শামিল। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হয়, তখন কিয়ামতের (অর্থাৎ ধ্বংসের) অপেক্ষা করো।
আজকের অশান্তি ও সন্ত্রাসবাদ আমাদের ভুল নির্বাচনেরই তিক্ত ফসল।
৪. নির্বাচনের তিনটি শরয়ি দিক
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর গবেষণা অনুযায়ী, নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটার ও প্রার্থীর তিনটি প্রধান শরয়ি অবস্থান রয়েছে—
ক) সাক্ষ্য প্রদান : ভোটার তাঁর ভোটের মাধ্যমে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে এই প্রার্থী যোগ্য ও বিশ্বস্ত। প্রার্থী যদি অযোগ্য হয়, তবে ভোটার ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ প্রদানের দায়ে কবিরা গুনাহগার হবেন।
খ) সুপারিশ : কোরআনের ভাষায়, যে ব্যক্তি ভালো সুপারিশ করবে সে তার সওয়াব পাবে, আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সে তার পাপের অংশীদার হবে। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৫)
অর্থাৎ আপনার ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তি পাঁচ বছর যে মন্দ কাজ করবে, তার দায় আপনার ওপরও বর্তাবে।
গ) প্রতিনিধিত্ব বা ওকালত : ভোটার প্রার্থীকে নিজের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। যেহেতু এটি জাতীয় বিষয়, তাই কোনো অযোগ্যকে উকিল বানালে পুরো জাতির অধিকার খর্ব করার পাপ ভোটারের আমলনামায় লেখা হবে।
৫. একটি জরুরি সতর্কতা
যেভাবে অযোগ্যকে ভোট দেওয়া গুনাহ, তেমনি একজন যোগ্য ও পরহেজগার ব্যক্তিকে ভোট না দিয়ে ঘরে বসে থাকাও শরয়ি অপরাধ। সত্য সাক্ষ্য গোপন করা কোরআন অনুযায়ী হারাম। অনেক সময় সৎ লোকেরা ভোটদানে বিরত থাকেন বলেই অসৎ লোকেরা অর্থ দিয়ে ভোট কিনে জাতির ওপর চেপে বসে। তাই কোনো এলাকায় যদি কয়েকজন প্রার্থীর মধ্যে একজনও পূর্ণ আদর্শবান না হন, তবে তাদের মধ্যে তুলনামূলক কম খারাপ বা যার দ্বারা মন্দের আশঙ্কা কম, তাকে ‘ক্ষতি হ্রাসের নিয়তে’ ভোট দেওয়া জায়েজ বরং উত্তম।
পরিশেষে, ভোট হলো একটি সাক্ষ্য। এটি গোপন করা, এতে মিথ্যা বলা বা এর বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা হারাম। ভোটের বিনিময়ে টাকা নেওয়া জঘন্যতম ঘুষ এবং দেশ ও ইসলামের সঙ্গে বিদ্রোহের শামিল। সামান্য দুনিয়াবি লাভের জন্য নিজের পরকাল বিসর্জন দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সূত্র : ১. তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮ দ্রষ্টব্য) ২. মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) রচিত প্রবন্ধ : নির্বাচনে ভোট, ভোটার ও প্রার্থীর শরয়ি মর্যাদা
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসা, ঢাকা
যে জুলুম ইবাদতকেও নিঃশেষ করে দেয়
মুফতি সাইফুল ইসলাম
রবিবার, ০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:৪৬
শেয়ার
যে জুলুম ইবাদতকেও নিঃশেষ করে দেয়
প্রতীকী ছবি
ইসলাম শুধু আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেয় না; বরং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক তথা হক্কুল ইবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। নামাজ, রোজা, হজ ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রতি জুলুম, অপবাদ, গীবত, সম্মানহানি কিংবা অধিকার হরণ করলে সে ইবাদতই কিয়ামতের দিন তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে দুনিয়াতেই হিসাব মিটিয়ে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের হক এমন এক ঋণ, যা তাওবা করলেও ক্ষমা হয় না, যতক্ষণ না হকদার ক্ষমা করে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও ভীতিকর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোনো দ্বীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের বিচারব্যবস্থার একটি ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
সেদিন কোনো অর্থ, সম্পদ বা সুপারিশ কাজে আসবে না; একমাত্র লেনদেন হবে আমল দিয়ে।
১. “সম্ভ্রমহানি” কেন আলাদা করে উল্লেখ?
ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বলেন : ‘মানুষের ইজ্জত ও সম্মান ক্ষুণ্ন করা, গীবত, অপবাদ, অপমান এগুলো এমন যুলুম, যা মানুষ সহজে ক্ষমা করে না’ (ফাতহুল বারী, ৫/১০১) আজকের সমাজে কলম, মাইক, ফেসবুক পোস্ট কিংবা কথার আঘাতে যে সম্ভ্রমহানি হয়। এই হাদিস তার জন্য সরাসরি প্রযোজ্য।
২. দুনিয়াতেই মাফ করিয়ে নেওয়ার তাগিদ
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন: “আজই” (فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, হক্কুল ইবাদ আদায়ের ব্যাপারে দেরি করা মারাত্মক পরিণতির কারণ হতে পারে।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ১৬/১৪০)
৩. সেদিনের “দেউলিয়া” অবস্থা
এই হাদিসটি মূলত সেই প্রসিদ্ধ ধারণার সাথে সম্পর্কিত, যাকে অন্য হাদিসে বলা হয়েছে-মুফলিস (দেউলিয়া ব্যক্তি)। ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব আত-তাযকিরা ফি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখিরা-তে ‘মুফলিস (দেউলিয়া)’ সংক্রান্ত হাদিস আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: ‘প্রকৃত দেউলিয়াত্ব দুনিয়ার সম্পদের অভাব নয়; বরং আখিরাতে মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমল নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। (আত-তাযকিরা, পৃ. ৩৪৯)
৪. পাপ স্থানান্তরের ভয়াবহতা
হাদিসে বর্ণিত সবচেয়ে ভীতিকর অংশ হলো— ‘যদি জালিমের কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মজলুমের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: ‘এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণ প্রকাশ; যেখানে কোনো জুলুম বিনা প্রতিদানে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
’ (মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ১৮/৩২১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়— ইবাদতের পাশাপাশি আখলাক ও ইনসাফ অপরিহার্য। মানুষের অধিকার হালকাভাবে নিলে কিয়ামতের দিন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। আজ ক্ষমা চাওয়া অপমান নয়; বরং আখিরাতের মুক্তির পথ। আজ যে জুলুমকে তুচ্ছ মনে হয়, কাল সেটাই হতে পারে মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
লেখক: প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
news_google_icon_128কালের কণ্ঠের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য
ইসলামী জীবন
কোরআনের বাণী
সূরা বনী-ইসরাঈলের আলোকে নুহ (আ.)-এর কৃতজ্ঞতা ও তাওহীদের আহ্বান
ইসলামী জীবন ডেস্ক
রবিবার, ০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:৪৭
শেয়ার
সূরা বনী-ইসরাঈলের আলোকে নুহ (আ.)-এর কৃতজ্ঞতা ও তাওহীদের আহ্বান
প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : বনী-ইসরাঈল, আয়াত : ৩
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
ذُرِّیَّۃَ مَنۡ حَمَلۡنَا مَعَ نُوۡحٍ ؕ اِنَّهٗ كَانَ عَبۡدًا شَكُوۡرًا ﴿۳﴾
সরল অনুবাদ
(৩) তোমরাই তো তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে (কিশতীতে) আরোহণ করিয়েছিলাম, নিশ্চয় সে ছিল পরম কৃতজ্ঞ দাস।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা বনী-ইসরাঈলের এই আয়াতে কয়েকটি অনুবাদ হতে পারে।
এক. মূসা ছিলেন তাদের বংশধর, যাদেরকে আমরা নূহের কিশতিতে আরোহন করিয়েছিলাম। (আন-নুকাত ওয়াল উয়ুন; ফাতহুল কাদীর)
দুই. হে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমরা নূহের সাথে কিশতিতে আরোহন করিয়েছিলাম।
তোমাদেরকেই বিশেষ করে এ নির্দেশ দিচ্ছি। (বাগভী; ইবন কাসীর; আদওয়াউল বায়ান)
তিন. তোমরা আমাকে ব্যতীত আর কাউকে কর্মবিধায়ক বানিওনা। কারণ তারা তোমাদেরই মত মানুষ। যাদেরকে আমরা নূহের কিশতিতে আরোহন করিয়েছিলাম।
(ফাতহুল কাদীর)
মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ তারা হলো, নূহের সন্তানসমূহ ও তাদের স্ত্রীগণ এবং নূহ। তার স্ত্রী তাদের সাথে ছিল না। (তাফসিরে তাবারী)
আয়াতে আরও বলা হচ্ছে যে, নূহ ও তাঁর সাথীদের বংশধর হবার কারণে একমাত্র আল্লাহকেই অভিভাবক করা তোমাদের জন্য শোভা পায়। কারণ তোমরা যার বংশধর তিনি আল্লাহকে নিজের অভিভাবক করার বদৌলতেই প্লাবনের ধ্বংসকারিতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
বিভিন্ন হাদিসেও নুহ আলাইহিস সালামকে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। শাফাআতের বৃহৎ হাদিসে এসেছে যে, লোকজন হাশরের মাঠে নুহ আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে নুহ! আপনি জমীনের অধিবাসীদের কাছে প্রথম রাসুল আর আল্লাহ। আপনাকে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে ঘোষণা করেছে। (বুখারি, হাদিস :৪৭১২)
নুহ আলাইহিস সালামকে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে বলার পিছনে আরো একটি কারণ কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে, নূহ আলাইহিস সালাম যখনই কোনো কাপড় পরতেন বা কোনো খাবার খেতেন তখনই আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। সে জন্য তাকে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
(মুস্তাদরাকে হাকেম: ২/৬৩০)
মোট কথা নূহ (আ.)-এর প্লাবনের পর মানব বংশের উৎপত্তি তাঁর (নুহ আলাইহিস সালাম) সেই ছেলেদের থেকে হয়েছে, যারা নুহ আলাইহিস সালাম-এর কিশতীতে সওয়ার ছিল এবং প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এই জন্য বানী-ইস্রাঈলকে সম্বোধন করে বলা হল যে, তোমাদের পিতা নুহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর বড়ই কৃতজ্ঞ বান্দা ছিলেন। অতএব তোমরাও তোমাদের পিতার ন্যায় কৃতজ্ঞতার পথ অবলম্বন কর এবং আমি মুহাম্মাদ (সা.)-কে যে রাসুল বানিয়ে প্রেরণ করেছি তাকে অস্বীকার করে সে নিয়ামতের কুফরী করো না।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে সে ভুলের মাঝেই ফিরে আসার পথ খুঁজে নিতে পারে। সেই ফিরে আসার নামই তওবা। আর তওবাকে স্থায়ী ও ফলপ্রসূ করে যে গুণ, তাহলো আত্মসংযম। তওবা ও আত্মসংযম-এই দুইয়ের সম্মিলনেই মানুষের অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, সমাজে ফিরে আসে নৈতিক শুদ্ধতা।
তওবা কেবল পাপ স্বীকারের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হৃদয়ের গভীর অনুতাপ, ভুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং আল্লাহর দিকে নতুন করে যাত্রা শুরু করার অঙ্গীকার। কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা যুমার-৫৩)। এই আয়াত মানবজাতিকে আশ্বাস দেয়-ভুল যত বড়ই হোক, তওবার দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
’ অপর আয়াতে মহান প্রভু ঘোষণা করেন, ‘হে মুমিনগণ তোমরা তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নূর-৩১)
তওবা করার ফলাফল এবং ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি তওবা করো, তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত বর্ষণ করবেন, তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য বাগানসমূহ তৈরি করবেন ও প্রবাহিত করবেন নদীমালা।’ (সুরা নূর-১০, ১১, ১২)
তওবার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্জন করা যায় প্রশান্তি ও যাবতীয় কল্যাণ।
তওবা মানুষের আত্মাকে হালকা করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং জীবনে নতুন আলো জ্বালায়। পরকালে পাওয়া যায় চিরশান্তি ও আল্লাহর করুণা।
তওবা করার জন্য অন্যতম শর্ত হলো: ইমান গ্রহণ করা, মৃত্যুর নিকটবর্তী হওয়ার আগে তওবা করা, আল্লাহতায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে তওবা করা, পাপ বর্জন করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া, কৃত পাপাচারের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং মানুষের প্রাপ্য সম্পর্কিত পাপ হলে এর প্রাপক বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে তা ফেরত দিয়ে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করা। তাই তওবা যদি হয় ক্ষণিকের আবেগ, আর আত্মসংযম না থাকে, তবে সেই তওবা দ্রুতই ভেঙে পড়ে। আত্মসংযম মানে কেবল ইচ্ছা দমন নয়; এটি সচেতন নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক সীমার ভিতরে থাকার সাধনা।
ইসলামে আত্মসংযমের শিক্ষা সর্বত্র- চোখের হিফাজত, জিহ্বার সংযম, হালালহারামের পার্থক্য রক্ষা ইত্যাদি। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, মুসলিম)
বর্তমান সমাজে ভোগবাদ, লোভ ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি মানুষকে মুহূর্তে ভুলের দিকে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্মুক্ততা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার মোহ-সব মিলিয়ে সংযম হারালে মানুষ সহজেই নৈতিক সীমানা অতিক্রম করে। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি, পারিবারিক ভাঙন এবং সামাজিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তওবা এখানে আশ্রয়, আর আত্মসংযম হলো সেই আশ্রয়ে স্থায়িত্বের ভিত্তি।
তওবা মানুষকে আশাবাদী করে। যে ব্যক্তি তওবা করে, সে নিজের অতীতকে বোঝা নয়, শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে। আত্মসংযম তাকে ভবিষ্যতের পথে সঠিকভাবে চলতে সহায়তা করে। যেমন নদীর তীরে বাঁধ না থাকলে পানি ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি করে; তেমনি আত্মসংযম ছাড়া আবেগ ও প্রবৃত্তি জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সংযম সেই বাঁধ, যা শক্তিকে সঠিক পথে প্রবাহিত করে কল্যাণে রূপ দেয়। ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সমাজের ক্ষেত্রেও তওবা ও আত্মসংযম অপরিহার্য। দুর্নীতি, মিথ্যাচার, হিংসা-এসব সামাজিক ব্যাধির মূলে রয়েছে সংযমের অভাব। যখন ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটে, তখন সমাজও সুস্থতার দিকে অগ্রসর হয়। তওবা সামাজিক সম্পর্ককে মেরামত করে; আত্মসংযম পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা বাড়ায়।
তওবা ও আত্মসংযম চর্চার পথ সহজ নয়, তবে সম্ভব। নিয়মিত আত্মসমালোচনা, ইবাদতে যত্ন, নেক সঙ্গ ও সৎ পরিবেশ এই পথে সহায়ক। বিশেষ করে নীরব মুহূর্তে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন-আমি কোথায় ভুল করেছি, কোথায় সংযম হারিয়েছি, এই প্রশ্ন মানুষকে সঠিক পথে ফেরায়। তওবা তখন শুধু মুখের কথা থাকে না; জীবনের দিশা হয়ে ওঠে। তওবা মানুষকে আলোর দিকে ফেরায়, আর আত্মসংযম সেই আলোকে ধরে রাখে। এই দুই গুণ ছাড়া ব্যক্তির মুক্তি যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি সমাজের শান্তিও দুর্লভ। অস্থির সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার অন্তরের এই সংস্কার-ভুল থেকে ফিরে আসার সাহস এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার শক্তি। তওবা ও আত্মসংযম-এই যুগল সাধনাই পারে মানুষকে মানুষ করে তুলতে, সমাজকে দিতে পারে স্থায়ী শান্তি।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
কমেন্ট বক্স