কারগার সাহিত্য বা জেলাখেনায় লেখালেখি: সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
আপলোড সময় :
২৫-০৮-২০২৫ ০৬:০৬:০১ পূর্বাহ্ন
পৃথিবীর ইতিহাসে মতাদর্শিক কারনে বা ভিন্নমতের ফলে মজলুম হিসাবে জেল খাটা এমন অনেক রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক, গবেষক, আলেম উলামা রয়েছেন যারা জেলখানায় বসে লিখেছেন বই বা অমর সাহিত্য।কারাগার সাহিত্য বা Prison literature বিশ্বসাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাস ও ধর্মীয় কিতাব রচনায় জেলখানায় বসে কিতাব রচনার ইতিহাস ইলমি জগতের অমূল্য সব অমর মহা রত্নভান্ডার। মাওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস লিখেছিলেন কাফনের কাপড়ে কয়লা দিয়ে "কাফনের কাপড়ে লেখা ইতিহাস" যা ভারত বর্ষের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলীল। আল্লামা ইবনে তাইমিয়ার অধিকাংশ কিতাব বন্দিশালায় বসে লেখা।
কারাগার সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাচীন সম্পদ হিসেবে আমরা রোমান দার্শনিকের রাজনীতিবিদ সেভেরিনাস বোথিয়াসের লেখা Consolation of Philosophy (দর্শনের সান্তনা) বইটা দেখি। বইটা লেখা হয়েছে ৫২৪ খৃ. কারাগারে বসে। ইতালির বিখ্যাত কবি দান্তে আলিগিয়েরি (১২৬৫-১৩২১ খৃ.) ফ্লোরেন্সে নির্বাসনের শেষ দিকে বসে বসে লিখেছিলেন জনপ্রিয় দার্শনিক উপন্যাস ডিভাইন কমেডি। কারাগৃহেই মিগুয়েল দ্য সর্ভেন্তিস ‘দন কিহোতে’-বইয়ের প্রথম খণ্ড লেখেন। চিরায়ত অন্তর্ঘাত-সাহিত্য হিসেবে যা মান্য আজও।
ইসলামি ইতিহাসেও কারাগার সাহিত্যের দৃষ্টান্ত কম নয় বরং অনেক দীর্ঘ ও অমর সাহিত্য। মনে করা হয়,জলখানার নির্বাসিত বা নির্জন জীবনই এইসব অমর সাহিত্য সৃষ্টির উৎস। নতুবা এই লেখক ও লেখাগুলো অমর সাহিত্য হতো না। আলেমদেরকে কারাগারে বন্দি করা হলেই তারা কোন না কোন কিছু লিখে সময়কে কাজে লাগাবার চেষ্টা করতেন। বিখ্যাত হানাফী ফকিহ ও উসুলবিদ শামসুল আইম্মাহ মুহাম্মদ সারাখসির (৪৯০ হি.) কথা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। একটা মাসআলার দরুণ কারাগারে যেতে বাধ্য হন ৪৬৬ হিজরিতে। এই কারাগারে তাকে থাকতে হয়েছে প্রায় ১৫ বছর। এই সময়ে তিনি ১৫ খণ্ডে ‘মাবসুত’ কিতাবখানা রচনা করেন। বর্তমানে এটি প্রায় ৩০ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। হানাফী ফিকহশাস্ত্রের একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে এটি স্বীকৃত। এছাড়াও কারাগারে বসেই ব্যাখ্যা করেছিলেন শাইবানী রহ.-এর ‘আস-সিয়ারুল কাবির’।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর কারাগারের অভিজ্ঞতাও কম নয়। তাঁর কারাবরণের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ইতিহাসের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ২১বার কারা বরণ করেছেন। ঠুনকো ঠুনকো অজুহাতে। বিরোধীর মতপার্থক্য যখন হিংসায় রূপ নেয়, সেই হিংসার শিকার হয়েই তাকে যেতে হয়ে জেলে। সাতবারের জেলের সার্বিক সময় হবে আনুমানিক পাঁচ বছরের মত। প্রথম কারাগারে বসে তিনি লিখেছিলেন ‘আস-সারিমুল মাসলুল ফি সাতিমির রাসূল’।এছাড়াও তিনি কারাগারে থেকে বিভিন্ন চিঠি লিখেছিলেন। ইদানিং একজন গবেষক সেগুলো একত্র করে বের করেছেন ‘রাসায়েল মিনাস সিজনি’ নামে। তার লেখা পরবর্তী ৩৫ হাজার রেসালার অধিকাংশই কারাগারে বসে লেখা। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম বুখারী ও ইমাম গাজালীর ইলম ও দর্শনের একটি বড় অংশ কারাগারে বসেই লেখা।
তুরস্কের দরবেশ আলেম বদিউজ্জামান সাইদ নুরসীকেও (১৮৭৭-১৯৬০ খৃ.) জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়েছে, তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রাসায়েলে নুর সমগ্র’ জেলখানায় বসে লেখা।
উদাহরণ আরও রয়েছে। সেসবও একই কথা বলে। জয়নব আল গাজালীটর বিখ্যাত বই " কারাগারে রাতদিন"। আগুনের কারাগার আব্দুর রাজ্জাক হেকনোভিকের জগত বিখ্যাত বিপ্লবী বই।
জেলে থাকাকালে কিছুটা নিজস্ব সময় পান সৃজনশীল মানুষ। সে কারণে ‘দন কিহাতে’ এমন একটি উপন্যাস যার সঙ্গে তুলনা করে অন্য সাহিত্যের মান নির্ধারণ করা হয়। নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ পড়লে বা আবৃত্তি শুনলে যে কোনো সাধারণ পাঠক, শ্রোতার শরীরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যায়। আবেগের এতো ঘন বয়ান, হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা, শব্দ ও কথার ঝংকার নিয়ে ‘জেলখানার চিঠি’ যেন সব যুগের বিপ্লবী ও বিদ্রোহীর কাছে এক প্রাণ সঞ্জীবনী কবিতার অংশ হয়ে ওঠে।
জয়নাব আল-গাযালীর লেখা ‘আইয়ামুম মিন হায়াতী’। জেলখানা থেকে বের হওয়ার পর বইটা তিনি জেলখানায় লিখেন।সৈয়দ কুতুবের ছোট বোন। ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালে তাকেও বন্দি করা হয় নাসেরী কারাগারে। প্রায় ছয় বছরের মত তাকে থাকতে হয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বের হওয়ার পর তিনি উপন্যাসের আঙ্গিকে লেখেন ‘রিহলাতুন ফি আহরাশিল লাইল’ (রজনির ঝোপঝাড়ে যাত্রা)।
কার্ল মার্ক্সের সবচেয়ে অগ্রসর বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ইতালির অ্যান্তোনিও গ্রামসি তার ‘প্রিজন নোটস’-এ। তাই জেল-সাহিত্যের সব থেকে বিস্ফোরক উদাহরণ ধরা হয় ইতালীয় রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ আন্তোনিও গ্রামশির ‘প্রিজন নোটবুকস’-কে।
মিগুয়েল ডে সার্ভেন্তেস। আর জেলখানায় বসে লেখা তার ওই বইটিও এখন জগদ্বিখ্যাত- ‘ডন কিহোতে’। ছেলে-বুড়োর সবারই প্রিয় বই কয়েকশো বছর ধরে। অথচ তেমন একটি বই লেখা শুরু হয়েছিল কিনা জেলখানায়!
নেলসন ম্যান্ডেলা। বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ের অবিসংবাদিত নেতা। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে কাটিয়েছেন কারাগারে, মোট কারাবাস করেছেন ২৭ বছর। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য শান্তিতে নোবেল পান ১৯৯৩ সালে। তার আত্মজীবনীর নাম ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ যা কিনা জেলে বসে লেখা।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর ‘গ্রিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ বইটিও ১০ বছর জেলে থাকার সময়ে লেখা। তার অনেক লেখাই জেলখানায় বসে লেখা হয়েছে। জওহরলাল নেহরুর সব বড় লেখাই জেলখানায় বসে হয়েছে। তার ‘আত্মজীবনী’, ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’, ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’, ‘মেয়ের কাছে বাবার চিঠি’ এ সবগুলোই জেলে বসে লেখা। তার লেখাগুলো জওহরলালকে ভারতের একজন সেরা লেখকে পরিণত করেছে। একবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বক্তৃতা দিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কোনো বিদেশি সুহৃদ, যিনি তার লেখার মুগ্ধ পাঠক। জিজ্ঞেস করলেন- তিনি ইদানীং লিখছেন না কেন? বেশ রসালো উত্তরই দিলেন নেহরু- ‘ইদানীং তো আর জেলবাস হচ্ছে না তেমন।’
ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী বাল গঙ্গাধর তিলক , মান্দালয়ের বার্মার কারাগারে থাকাকালীন কর্ম যোগের বিশ্লেষণ " গীতা রহস্য " লিখেছিলেন। ইই কামিংস ১৯২২ সালের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস "দ্য এনরমাস রুম" প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসিদের দ্বারা গৃহবন্দী অবস্থায় ব্যক্তিগত চিঠিতে যুদ্ধবিরোধী অনুভূতি প্রকাশের অভিযোগে লেখা হয়েছিল। ১৯২৩ সালের নভেম্বরে বিয়ার হল অভ্যুত্থানের পর কারাগারে থাকাকালীন অ্যাডলফ হিটলার তার আত্মজীবনীমূলক ও রাজনৈতিক মতাদর্শগত বই " মেইন কাম্ফ" লিখেছিলেন। ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি ১৯৩০-এর দশকে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকারের হাতে বন্দী থাকাকালীন তার বেশিরভাগ রচনা লিখেছিলেন; এটি পরে প্রিজন নোটবুক নামে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এতে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তার প্রভাবশালী তত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত ছিল ।
ইরানি লেখক মাহমুদ দৌলতাবাদী ৫০০ পৃষ্ঠার " মিসিং সোলুচ" বইটি লিখেছিলেন যখন তিনি বন্দী অবস্থায় ছিলেন, কোনও কলম বা কাগজ ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজের মাথায়, তারপর মুক্তি পাওয়ার ৭০ দিনের মধ্যে এটি অনুলিপি করেছিলেন।
ফরাসি বিপ্লবের কালে মার্কি দ্য সাদ তার জীবনের সাড়া জাগানো উপন্যাসগুলো লেখেন লুনাটিক অ্যাসাইলামে বন্দি অবস্থায়। চরম অন্তর্ঘাতমূলক ‘১২০ ডেজ অব সোদোম’ বা ‘জুলিয়েট’ বেকায়দায় ফেলে দেয় ফরাসি সরকার থেকে শুরু করে ক্যাথলিক চার্চকেও।
জেলে বসেই বালগঙ্গাধর তিলক তার গীতাভাষ্য লেখেন। যা পরে হয়ে দাঁড়ায় সশস্ত্র বিপ্লবীদের ম্যানুয়াল।
কাজী নজরুল ইসলামের জেলবাসের ভালো অভিজ্ঞতা আছে। জেলবাস যে তার সৃষ্টিশীলতায় ভূমিকা রেখেছে সেটা বলাই বাহুল্য।ঢাকা: শেখ মুজিবুর রহমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি লিখেছেন কারাগারের মধ্যেই। সেটি হলো বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও কারগারের রোজ নামচা।মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কারাগারে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়ার পাশাপাশি লেখালেখিও করছেন। সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে কারাগারে বসে তার লেখা বই ‘নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্য’। আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ লিখেছেন মাওলানা ফরীদ এখন কারাগারে, "মিম্বর থেকে কারাগারে"। বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিবিদ কারাগারে বই লিখেছেন, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ লিখেছেন কারাগারের কেমন ছিলাম। সম্পাদক মাহমুদুর রহমান লিখেছেন জেল থেকে জেলে। গত ২২ আগষ্ট ২৫ বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরামের ১যুগপূর্তী অনুষ্ঠানে আল্লামা মামুনুল হক বলেছেন, বিখ্যাত ও অমর লেখক হতে চান তাহলে কারাগারে যেতে হবে। তিনি কারাগারে বসে লিখেছেন " কারাগার থেকে বলছি, এবার জেলখানায় বসে লিখেছেন ১৫শ পৃষ্ঠার আত্মজীবনী।
জেলখানায় লেখা আরও কিছু বিখ্যাত বই হলো- নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’, অ্যান্তোনিও গ্রামসির ‘প্রিজন নোটস’, থমাস পাইনের ‘দ্য এজ অব রিজন’, হুগো গ্রোশিয়াসের ‘অন দ্য ল অব ওয়ার অ্যান্ড পিস’, বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ফিলোসফি’, অ্যাডলফ হিটলারের আত্মজীবনী ‘মেইন ক্যাম্ফ’, ডানিয়েল ডিফোর ‘হিম টু পিলোনি’, মার্কো পোলোর ‘চীন ভ্রমণের কথা’ এবং ও হেনরির লেখা বহু বিখ্যাত ছোটগল্প।
ফ্রানকোইস মারিয়া অ্যারোয়েৎ ওরফে ভলতেয়ারও ১৭৫৭ সালের মে মাসে ফ্রান্সের কুখ্যাত বাস্তিল কারাগারে বন্দি থাকার সময় তার বিখ্যাত মহাকাব্য ‘হেনরিয়াদ’ লেখা শুরু করেন। জন বানিয়ন জেলে বসে ১৬৭০ সালে লেখেন অমর গ্রন্থ ‘দ্য পিলগ্রিম প্রগ্রেস’।
বন্দিত্ব অনেক কষ্টকর কিন্তু এর ক্ষতিপূরণের দিকও আছে। এসব লেখকসহ আরো অনেকের জীবনে সৃষ্টিশীলতার পেছনে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে জেলজীবন। তাহলে কি এ কথা বলা যায়, যদি বড় লেখক হতে চান, তবে জেলে যান।
কমেন্ট বক্স