২১ অক্টোবর ২০২৬ , ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ঝিনাইদহে বরাদ্দের সার বিক্রি হচ্ছে মুদি দোকানে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ১৭-১২-২০২৫ ০৯:৫৯:৩৯ পূর্বাহ্ন
ঝিনাইদহে বরাদ্দের সার বিক্রি হচ্ছে মুদি দোকানে

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী রাসায়নিক সার বিক্রির জন্য নির্ধারিত ডিলার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মুদি দোকানে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে কৃষকদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপিসহ নানা ধরণের সার।

খাদ্যদ্রবের পাশে এসব সার মজুদ ও বিক্রি করায় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎকসরা বলছেন, খাদ্যপণ্যের সঙ্গে সার সংরক্ষণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 
সারের রাসায়নিক উপাদান খাদ্যে মিশে মানুষের শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

 

এদিকে কৃষি বিপণন আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া সার বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কার্যকর নজরদারি ও যথাযথ শাস্তির অভাবে মুদি দোকানিরা নির্বিঘ্নে এই বরাদ্দকৃত সার বিক্রি করে যাচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কোটচাঁদপুর উপজেলার লক্ষীপুর, ফুলবাড়িয়া, জালালপুর, পাঁচলিয়া, দোড়া, কুশনা, তালসারসহ আন্তত ২০ টি বাজারের মুদি দোকানে প্রকাশ্যে কৃষকের বরাদ্দের সার বেচাকেনা করা হচ্ছে।

 
এসব দোকান থেকে সহজে সার পেলেও কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা গুণতে হচ্ছে। আবার ওই সকল দোকানে দাম বেশি নিলে বাকিতেও সার নিতে পারে কৃষকরা। অনেক সময় ফসল উঠলে টাকা পরিশোধ করেন তারা। অনেকে দোকানি আবার অস্বচ্ছল কৃষকদের দাদন হিসেবে সার দিয়ে থাকে।
 
তবে উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের একভাগ মুদি দোকানিরা নিয়ে নেয়।

 

সম্প্রতি সরেজমিনে ওই বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ধরণের সর্তকতা বা সংরক্ষণবিধি মানা হচ্ছে না। চিনি, ডাল ও ভোজ্যতেলের সঙ্গে একই সাথে রাখা হয়েছে রাসায়নিক সার। আবার অনেক দোকানের পেছনের দিকে গোডাউন করে সার মজুদ করে রেখে দিয়েছে। কোনো ধরণের স্বাস্থ্যবিধি না মেনইে একই সঙ্গে মুদি মালামাল ও সার বিক্রি করছে।

 
এমনকি সার বিক্রি শেষে হাত পরিষ্কার না করেই শিশুদের কাছে পণ্য বিক্রি করছে। স্থানীয় কৃষকের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে চলছে এই অভৈধ বাণিজ্য।

 

বিশেষ সূত্র জানায়, বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলাররা তাদের বরাদ্দের সার স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বাজার মূলের চেয়ে বেশি টাকায় মুদি দোকানিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে বাজারে সারের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক মুদি দোকানি ২১ টাকার সার ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করছে। এছাড়াও অন্যান্য সার বাজারমূলের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। যে সকল দোকানিরা স্বচ্ছল তারা কৃষকদের মৌসুম চুক্তিতে দাদন হিসেবে সার দিয়ে থাকে। এতে তাদের লাভ আরো বেশি হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের সখ্যতা ভালো থাকায় তাদের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পর্যন্ত পরিচালনা হয় না। এতে করে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা তাদের বরাদ্দের সার থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে।

ফুলবাড়িয়া এলাকাল নওশের আলী নামের এক কৃষক বলেন, ‘ডিলারদের কাছে গেলে বলে সার নেই। সারের জন্য আমাদের চাষ বন্ধ হওয়ার উপক্রম তাই বাধ্য হয়ে এসব দোকান থেকে আমাদের সার কিনতে হচ্ছে। মুদি দোকানিরা সবসময় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে থাকে আমাদের কাছ থেকে। অনেক সময় তারা কৌশলে ওজন পর্যন্ত কম দেয়। আবার তাদের সারের মান তেমন একটা ভালো না। এ নিয়ে আমরা অনেকবার কৃষি অফিসারকে জানিয়েছি তবে কোনো লাভ হয়নি।’

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. লিমন পারভেজ বলেন, ‘খাদপণ্যের সঙ্গে রাসায়নিক সার সংরক্ষণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সারের রাসায়নিক উপাদান খাদ্যে মিশে মানবদেহে মারত্মক ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার ও চর্মরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য এ রোগগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।’

জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘সারা জেলায় সারের জন্য হাহাকার চলছে, এদিকে কিছু অসাধু ডিলার বেশি দামে মুদি দোকানিদের দিয়ে সার বিক্রি করাচ্ছে। এ ঘটনা কৃষি বিভাগের জন্য চরম ব্যর্থতার। অবিলম্বে এ সকল মুদি দোকানিদের বিরুদ্ধে কৃষকের বরাদ্দের সার বিক্রি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ বাজার তদারকির ব্যবস্থা করা হোক। তা না হলে কৃষি উৎপাদন যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।’

এ ব্যপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সার মুদি দোকানে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে মুদি দোকানে সার বিক্রি করার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যাঁরা এ ধরণের অবৈধ সারের ব্যবসা করছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিগগিরই ওই সকল দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শাস্তি প্রদান করা হবে। এছাড়াও এ ঘটনায় কৃষি বিভাগের লোকজন জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ