৪ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, অষ্টগ্রামের ইউএনও প্রত্যাহার
৭৪ সেচ প্রকল্পে ৪ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোছা. দিলশাদ জাহানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে বর্তমান পদ থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনুলিপি পাঠানো হয়। একই সঙ্গে ২ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থল জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে যোগদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চলতি সেচ মৌসুমে হাওরের অষ্টগ্রামে ৭৪টি সেচ প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ মতে, কতিপয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার মদদে ও যোগসাজশে ইউএনওর নেতৃত্বাধীন উপজেলা সেচ কমিটি ওইসব সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) নিয়োগে অন্তত চার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।
৭৪টি সেচ প্রকল্পের মধ্যে ভাতশালা বৃহত্তর সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক পদে আবেদনকারী অষ্টগ্রামের ভাতশালার মাহবুব আলম কিসমত এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। বিজ্ঞ বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজি ও বিচারপতি রাজিউদ্দীন আহমেদের বেঞ্চ ২০ নভেম্বর শুনানি শেষে উপজেলা সেচ কমিটির বিরুদ্ধে রুল করেন।
একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রকল্পটি কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। স্থগিতাদেশ রহিত করে ভাতশালা বৃহত্তর সেচ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক ফাইজুল হক ওরফে আসাদুল হক রাজনকে প্রকল্পের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশ চেয়ে হাইকোর্টের একই বেঞ্চে আপিল করা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, ফাইজুল হক রাজন অষ্টগ্রাম উপজেলা ছাত্রলীগের নেতা ও আওয়ামী লীগ মনোনীত অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসনে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রত্না হকের ছেলে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক নিয়োগে ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি হয়েছে।
হাওরের কৃষকদের দাবি, উপজেলা সেচ কমিটির বৈঠকের আগেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যে কারণে তারা ভীষণ ক্ষতির শিকার হন। এর প্রতিবাদে কৃষকরা এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন অফিসারদের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এতকিছুর পরও প্রশাসন অনিয়ম চালিয়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, বিএডিসির স্থানীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলীর যোগসাজশে ইউএনওর নেতৃত্বাধীন সেচ কমিটি ৬ নভেম্বর ইউএনও অফিসের নোটিশ বোর্ডে হঠাৎ ম্যানেজার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে।
অভিযোগ রয়েছে, সেচ কমিটি নিয়মানুযায়ী সব কৃষকের আবেদন যাচাই না করে, কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা না করে এবং কোনো সভা না করেই এ তালিকা প্রকাশ করে। তালিকাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো অষ্টগ্রাম উত্তাল হয়ে ওঠে।
এ নিয়ে গত ১২ নভেম্বর কালের কণ্ঠে ৭৪ সেচ প্রকল্পে ৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন শিরোনামে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়।
একটি সেচ প্রকল্পে ম্যানেজার পদে আবেদনকারী শিপু চৌধুরী জানান, এ ক্ষেত্রে বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বাইরেও আবেদনকারীদের কাছে থেকে নেওয়া ঘুষের টাকাগুলো এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি।
তবে সদ্য বদলি হওয়া ইউএনও মোছা. দিলশাদ জাহান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নিজের ওপর ওঠা অভিযোগ স্বীকার না করে জানিয়েছেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
প্রশাসনের সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের অভিযোগ, নথির অসংগতি এবং কৃষকদের বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে প্রশাসনে চাপ বেড়ে যায়। অবশেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে শূন্যপদে সংযুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেন।
ইউএনওর প্রত্যাহারের খবরে অষ্টগ্রামের কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও ঘুষের টাকা ফেরত না পেয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন, সেচ প্রকল্পে স্বচ্ছ নিয়োগ এবং অনিয়মের তদন্ত করে অবিলম্বে দুর্নীতিবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কথিত নেতাদের বিচার করা হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রত্যক্ষ ভোটে সেচ প্রকল্পগুলোতে নতুন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়ারও দাবি জানান কৃষকরা।
এদিকে, সদ্য বদলি হওয়া অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. দিলশাদ জাহানের নেতৃত্বাধীন উপজেলা সেচ কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে ৭৪ সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মনোনয়নে সীমাহীন ঘুষ-দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন করা হয়েছে। বৃহত্তর কাস্তুল-ভাতশালা সেচ প্রকল্পের ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) পদে আবেদনকারী এম আর চৌধুরী শিপু গত ২০ নভেম্বর এ আবেদনটি দাখিল করেন
কমেন্ট বক্স