২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

এম. ফয়সাল আহমাদ রিয়াদ, সৌদি আরব

প্রবাসীর নিঃশব্দ সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও সফলতা

আপলোড সময় : ১৭-০৮-২০২৫ ০৩:২৯:৩৮ অপরাহ্ন
প্রবাসীর নিঃশব্দ সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও সফলতা


এক. 
প্রবাস জীবনটা যেমনিভাবে ত্যাগের ঠিক তেমনিভাবে আনন্দেরও, একদিকে পরিবারের মায়া মমতা বিসর্জন দিয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোর লড়াই, অন্যদিকে নিজের মূল্যবান সময়কে কাটিয়ে, অবসরবিহীন দিনরাত একাকার করে পাহাড়সম কষ্টের  এক নীরব আর্তনাদ। প্রথমবার প্রবাসের মাটিতে পা ফেলা ছেলেটির আত্মত্যাগ তো সীমাহীন। যেমন, দেশে থাকাবস্থায় একজন প্রবাস গমনেচ্ছু ছেলেটির যখন প্রবাসের সুর বেজে ওঠে, এবং ধাপে ধাপে প্রবাসে আসার সকল প্রসেসিং সম্পন্ন হতে থাকে। সবশেষ ফ্লাইটের তারিখটাও যখন খুবই সন্নিকটে এসে যায়, ঠিক তখনই এই ছেলেটির বু্‌ক ধড়পড় করতে শুরু করে। মা বাবা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন সবাইকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাটা ঘুরঘুর করতে থাকে হৃদয়ের গহীনে। তারপর নিজ ঘর থেকে বিদায়ের মুহুর্তে দূর দূরান্ত থেকে জমায়েত হওয়া স্বজনদের সম্মিলিত কান্না, আদরের সন্তান-কে জড়িয়ে ধরে বাবা মায়ের  চিৎকার, এসব সয়ে নিজেকে কন্ট্রোলে রেখে  ঘর ত্যাগ করে রওয়ানা হতে হয় অজানা অচেনা গন্তব্যের দিকে। পরবর্তীতে ঢাকা এয়ারপোর্টে প্রবেশের সময় শেষ বিদায়ী মুহুর্তে সাথে থাকা বাবা ভাই বা অন্য স্বজনের কান্না, তখন নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়লেও স্নেহের শেষ স্পর্শে দোয়া চেয়ে বিদায় দেয়া হয়। 
দুই.
প্রবাসে আসার পর একজন প্রবাসীকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। ছোট্ট একটা স্যুটকেস, কয়েক সেট জামাকাপড় নিয়ে আসা ছেলেটা কল্পনাই করেনি এমন সমস্যায় ভূগবে। 
ভাষা না বোঝা, বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে চলাফেরা, নিজে রান্নাবান্না করা, টাইম টু টাইম ডিউটি করা, চাইলেই পরিবারের সাথে কথা বলার সময় না পাওয়া ইত্যাদি। দেশে থাকাকালীন সময়ে নিজের মা হয়তো কাপড় ধুয়ে দিতেন, রান্না করে খাওয়াতেন। ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতেন। কিন্তু প্রবাসে আসার পর সবকিছু নিজেকে করতে হয় । প্রাথমিক অবস্থায় কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে এসব সহ্য করে নিতে হয়। মূলত প্রবাসীদের জীবনে যে কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা বাইরের চোখে সহজেই ধরা পড়ে না, কিন্তু দেশে থাকা পরিবার মানুষজন মনে করে প্রবাসে পৌঁছতে পারলেই হলো। টাকা এমনিতেই চলে আসবে। কিন্তু কষ্টের মাঝে ডুবতে থাকা ছেলেটার ভাবনা, তাঁরা বুঝতেই পারেনা কিভাবে সে দিনাতিপাত করে। এতোকিছুর পরেও হাল না ছেড়ে পরিবার-কে সুখে রাখতে, ছেলেটা তার সর্বস্ব দিয়েও নিজ মুখ থেকে উফ শব্দও বলেনা।   
তিন. 
বাংলাদেশ থেকে যাঁরাই প্রবাসে আসেন, তাঁদের অধিকাংশ-ই ধার বা ঋণ করেন, আবার কেউ কেউ ব্যাংক থেকে লোন তোলে ভিসা প্রসেস সহ সবকিছুর কাজ সারেন। পরবর্তীতে প্রবাসের ইনকাম দিয়ে তা পরিশোধ করেন। বিশ্বের নানান দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বাঙালি প্রবাসীরা, কারও গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, যেমন  সৌদি আরব, কাতার আরব আমিরাত কুয়েত বাহরাইন ওমান কারও মালয়েশিয়া, কেউ বা আবার ইতালি কিংবা আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসীরা সবচেয়ে বেশি যাচ্ছেন কাজের উদ্দেশ্যে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হলো সৌদি আরব, বর্তমানে তিরিশ লাখেরও বেশি বাঙালি ওখানে কর্মরত আছেন। বড় শ্রমবাজার হলেও বড় প্রতারণার জালও বিছিয়ে রেখেছে প্রতারকরা। এই ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই আমছালা সবই হারিয়েছেন। নিজের স্বচক্ষে দেখা অহরহ বাঙালীর স্বপ্ন চুরমার হতে দেখেছি। ঋণের বোঝার ভার সইতে না পেরে আত্মহত্যা করার জন্য প্রস্তুতিও দেখেছি।  পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা ও প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর আশা নিরাশায় পরিণত হতে দেখেছি। প্রবাসে আসা ছেলেটা যদি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখ আর কী আছে। সৌদী থেকে দালাল চক্র মিথ্যে প্রলোভনে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী আনে ঠিকই, কিন্তু কাজ দিতে না পারার কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে নিজেকেই হন্যে হয়ে কাজ খুঁজতে হয় অনেক প্রবাসীকে। ঠিক এখন পর্যন্ত যারাই সৌদীতে আসছেন, তাদের অধিকাংশই প্রতারণা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে কাজ খুঁজতে হচ্ছে। এটা সৌদীতে প্রতিদিনের চিত্র স্রেফ বাঙালীদের ক্ষেত্রে। অন্য দেশের লোকজন সৌদীতে এসেই নিজ নিজ কর্মস্থলে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করে। তাঁদের অধিকাংশ-ই কম খরচে আসে কোনো দুর্ভোগ পোহাতে হয়না, কাজের ব্যাপারে কোনো টেনশন করতে হয়না। আর বাঙালীদের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো চিত্র দেখা যায়।
অনেক ক্ষেত্রে নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রাও বিশ্বাসঘাতকতা করে। কিন্তু এই প্রতারণার পেছনে বাঙালীদের বড়সড় দোষ আছে। সেটা হলো একে অপরকে সাপোর্ট না করা, এতো মানুষজন থাকা সত্বেও সৌদীতে কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারেনি। যার মাধ্যমে একে অপরের সাপোর্ট করা যাবে। তা না করে আমরা উল্টো পথ বেছে নিয়েছি। উপর্যুক্ত কথাগুলোর সাথে মিল রেখে একটা উদাহরণ দিই। একজন প্রবাসী কারো মাধ্যমে সৌদী এসেছে, চারপাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে। দালাল বলেছে তাঁকে কপিশপের চাকুরী দেবে। সৌদীতে আসার পর তাঁকে তিন মাসের ইকামা ধরিয়ে দিয়ে, কাজের আশ্বাস আর মিথ্যে ওয়াদায় তিন চার মাস পর্যন্ত অতিবাহিত করে দিলো অথর্ব দালাল। পরবর্তীতে অচেনা গন্তব্যে আসা এই লোকটা যখন উপবাসে প্রহর গুনে আর নাকানিচুবানি খেয়ে হন্যে হয়ে নিজেই কোনো ভালো চাকুরীতে সেটেল হয়, এবং ভালো পজিশনের চাকুরীর ব্যবস্থা হয়ে যায়। ছয়মাস যাওয়ার পর এই লোকটাও দালালী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দেশ থেকে মিথ্যা আশ্বাসে লোক এনে চাকুরী দেয় না। বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু সে তাঁর অতীত ভুলে নিজেই দালালী কাজকে এক্সট্রা ইনকামের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। তাহলে বাঙালীদের কমিউনিটি কে দাঁড় করাবে? এই উদ্যোগ টা নেবে কে? এর বিপরীতে ইন্ডিয়ান ফিলিপিনো-দের বিশাল কমিউনিটি আছে যারা একে অপরকে সাপোর্ট করছে। ফলে চাকুরির ক্ষেত্রে তাঁরা এই শ্রমবাজারে এগিয়ে আছে ।
চার. 
 প্রবাসীরা নিজেদের কঠোর পরিশ্রমের যাঁতাকলে সঁপে দিয়ে, একটি সুন্দর আগামী গড়ার আশায় পরবাসে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করে। তাঁদের কাছে প্রতিটি দিন যেন সূর্যের চেয়েও কঠিন, আর রাতগুলো থাকে নিঃসঙ্গতার চাদরে মোড়া। তারপরও চুপসে থেকে সঙ্গ দিয়ে চলতে হয় ধৈর্য দক্ষতা ও সচেতনতার সাথে। প্রবাসীর সফলতা কেবল তার নিজের জন্য নয়, বরং পরিবার সমাজ এবং দেশের জন্যও গর্বের। বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা দক্ষতা এবং অর্থ তারা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তবে সফলতা শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয় প্রবাস জীবনে সততা, মানবিকতা, আইন মেনে চলা এবং নিজ সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করাও সফলতার একটি বড় অংশ। আমি মনে করি একজন প্রকৃত সফল প্রবাসী সেই ব্যক্তি, যিনি প্রবাসে থেকেও দেশের সুনাম রক্ষা করেন এবং নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের কল্যাণে ব্যবহার করেন। তাছাড়া প্রবাসীর সফলতা একদিনে আসে না এটি দীর্ঘ সময়ের ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফল। যারা সংগ্রাম করে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলেন এবং দেশের কল্যাণে অবদান রাখেন, তারাই প্রকৃত সফল। প্রবাসীরা আমাদের দেশের অর্থনীতি ও সুনামের অন্যতম বাহক। তাই বাংলাদেশে তাদের সম্মান দেওয়া এবং অনুকরণীয় হিসেবে দেখা না হলেও তাঁরা ধৈর্যের সাথে, কাঁদো কাঁদো হৃদয়টাকে হাসিমুখে বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছ্বাস নিয়েই দেশের মাটিতে পা রাখেন। 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ