২২ অক্টোবর ২০২৬ , ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

হিমাগারে আটকে ২০ লাখ বস্তা আলু, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ১৭৭ কোটি টাকা

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ৩১-১০-২০২৫ ০৬:৫৪:১৪ অপরাহ্ন
হিমাগারে আটকে ২০ লাখ বস্তা আলু, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ১৭৭ কোটি টাকা

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা এবারের মৌসুমে মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। ভালো দামের আশায় হিমাগারে সংরক্ষিত আলু এখন তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বাজারে দাম না বাড়া ও ক্রেতা সংকটের কারণে হিমাগারে জমে থাকা আলু বিক্রি করতে না পেরে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সূত্র জানায়, উপজেলার ১১টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় এক লাখ তিন হাজার ৯০০ টন বা ২০ লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু বিক্রি না হওয়ায় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।

 

 

নভেম্বর-ডিসেম্বরে নতুন মৌসুমে আলু রোপণের সময় ঘনিয়ে এলেও পুরনো আলু এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে হিমাগার খালি না করলে সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করলে প্রতিটি বস্তায় অন্তত ৮৫০ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে, ফলে কেউই আলু তুলতে আগ্রহী নন।

উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের সুড়াইল গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম আকন্দ বলেন, ‘ভালো দামের আশায় আমি চার হাজার বস্তা আলু ৬৪ লাখ টাকায় কিনে হিমাগারে রেখেছিলাম।

 
কিন্তু এখন দামের পতনে মাত্র ৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। প্রায় ৫৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে, সব সঞ্চয় শেষ।’

 

কালাইয়ের প্রতিটি হিমাগারেই একই চিত্র। উপজেলার পল্লী কোল্ড স্টোরেজে কৃষক ও ব্যবসায়ী মিলে ৪৬০ জন আলু সংরক্ষণ করেছিলেন।

 
শুধু এই হিমাগারেই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করছেন, সরকারিভাবে আলু কেনার কোনো উদ্যোগ না থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

 

আরবি স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজের মালিক প্রদীপ কুমার প্রসাদ বলেন, ‘আমাদের হিমাগারে দুই লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষিত ছিল। দেড় মাস আগেই এগুলো বের করার কথা ছিল, কিন্তু ব্যবসায়ীরা তুলতে পারছেন না। আলু তুললেই বড় ক্ষতি নিশ্চিত, তাই সবাই দ্বিধায় আছেন।

 
’

 

আলু ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান জানান, উৎপাদন থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিকেজি খরচ পড়েছে ২৪–২৫ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০–১১ টাকায়। এতে প্রতিকেজিতে ১৩–১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।’

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, গত মৌসুমে কালাইয়ে ১২ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে এক লাখ তিন হাজার ৯০০ টন আলু ১১টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ২০০ বস্তা আলু এখনও হিমাগারে পড়ে আছে। প্রতি বস্তায় গড়ে ৮৫০ টাকা লোকসান ধরলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।

গোলাহার গ্রামের ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত বলেন, ‘আমি ছয় হাজার বস্তা আলু রেখেছিলাম। এর মধ্যে এক হাজার বস্তা বিক্রি করেছি, বাকি পাঁচ হাজার বস্তা এখনও হিমাগারে। প্রতি বস্তায় ৯০০ টাকা লোকসান ধরলে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে আছি।’

এই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন উপজেলার প্রায় ১২ হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ী। উদয়পুর ইউনিয়নের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আলু চাষ করছি, কিন্তু এমন ক্ষতি কোনোদিন দেখিনি। এ বছর ২ হাজার ৭০০ বস্তা আলু রেখে ১৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।’

এম ইশরাত কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আবু রায়হান বলেন, ‘সরকার আলুর ন্যূনতম দাম কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে তা কার্যকর হয়নি। প্রশাসনের তৎপরতা না থাকায় দাম কমছেই। বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত।’

কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এ বছর আলুর বাম্পার ফলনে সরবরাহ বেড়ে গেছে, তাই দামও কমেছে। সরকার ২২ টাকা কেজি দরে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করেছে, তবে বাজারে তা কার্যকর করতে সময় লাগছে।’

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। সরকারিভাবে আলু কেনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত হলেও এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি। রপ্তানি ও বিকল্প বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।

এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন গত ৫ সেপ্টেম্বর আক্কেলপুর সফরে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সরকারিভাবে আলু কেনা হবে এবং টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। তিনি হিমাগার গেটে কেজিপ্রতি ২২ টাকা দরে আলু কেনা ও রপ্তানির আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এখন গভীর হতাশায় ভুগছেন।

 
 
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ