২০ অক্টোবর ২০২৬ , ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ

আমার আব্বা

আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৫ ১০:০১:১০ অপরাহ্ন
আমার আব্বা
 
সৈয়দ আব্দুল্লাহ রহ.। তরফরত্ন। সিলেট ও তরফ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব। এ অঞ্চলের মানুষের সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অসামন্য খ্যাতিমান মানুষ। আধুনিক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের অন্যতম বাকনির্মাতা। শিক্ষাবিদ ও চিন্তাশীল বরেন্য গুনী। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ইতিহাস গবেষক। বহুগ্রন্থপ্রণেতা। বিদগ্ধ পন্ডিত মনীষী। নিরলস কর্মবীর ও সাহিত্য সংগঠক। কিংবদন্তির এই মনীষা আমার জন্মদাতা পিতা!
 
ব্যাক্তি জীবনে তিনি ছিলেন, অত্যান্ত বিনয়ী, ধার্মিক, পরহেজগার, তাকওয়াবান বুজুগ ও নির্মোহ ব্যাক্তিত্ব। নিভৃতচারী সাধক। সাদামাটা চাল-চলনে ,সহজ সরল অমায়িক ব্যাক্তিত্ব। গম্ভীর,ধর্যশীল,পরোপকারি, সহনশীল, দাতা,দয়ালু,আত্মীয়তার হক রক্ষাকারি, সত্যভাষী, সবরকারী, শুকরকারী, ক্ষমাশীল, মেহমান নেওয়াজীতে আন্তরিক, পাড়াপ্রতিবেশি ও গরীব আত্মীয় স্বজনদের উপর এহসানকারী, ন্যায়পরায়ন, মুক্তচিন্তার অধিকারী, দক্ষ সাংগঠক, প্রজ্ঞাবান মনীষী, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ও শুকরগুজার। দেশ ,মাতৃকার তিনি ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী, জাতী ও উম্মাহকে নিয়ে ভাবনাকারী চিন্তাশীল গুনী, আদম সন্তানের প্রতি সহানুভতিশীল নরম ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী, হুসনে আখলাকের তিনি ছিেেলন উপমা, বাহাদুরী, অহংকার দাম্ভিকতা তিনি পছন্দ করতেন না। শিশুদের জন্য ছিলেন ¯েœহসূলভ শিক্ষক। কাজ ব্যাস্থ থাকতে ভালোবাসতেন, বই পড়া ছিল তার নেশা। কারো গীবত করা, পরনিন্দা, চুগলখোরি, পরচর্চা, হিংসা বিদ্ধেষ ছিল তার সভাবজাত বৈশিষ্টের বিপরীত। কখনো তিনি এসবের র্চচা করতেন না, তার সামনে কেউ করলে তিনি অত্যন্ত নাখোশ ও বিরক্ত হতেন, এমনকি সরাসরি নিষেধ করে দিতেন।
 
তিনি ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞাার অধিকারী এক পন্ডিত ব্যাক্তিত্ব, তার বহুমূখি কাজের এক বিরল প্রতিভা ছিল, সবার সাথে মিলে মিশে কাজ করার এক মহান ব্যাক্তিত্বে অধিকারী ছিলেন। অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তার ব্যাক্তিত্ব সকলকে প্রভাবিত করেতো। তিনি ছিলেন সুমহান ব্যাক্তিত্বের অধিকারী, যার ফলে নিভৃত পাড়া গায়ে আজীবন বাস করেও জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার কাজ ও পরিচিতি বিস্তৃত ছিল। তারকাছে দেশের সেরা লেখক ,গুনীজন থেকে শুরু করে বিশ্বের নানান দেশের গবেষক ও লেখকরা তথ্য উপাত্থের জন্য ছুটে আসতেন।
 
তার জীবনের ছোট থেকে ছোট বিষয় আর বড় থেকে বড় বিষয় ছিল আমার চোখের সামনে। আমার পিতা হলেও তিনি ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। বাবা ছেলের গল্প আড্ডা হতো দীর্ঘ সময়। কখনো কোন বিষয়ে যৌক্তিক তর্কও হতো। রাজনীতি থেকে সাহিত্য, দেশ থেকে আন্তর্জাতিক সব বিষয়ে আব্বার সাথে আমার আলোচনা হতো। সারা জীবন পিতার সাথেই কাটিয়েছি তবুও বিশেষ করে তার জীবনের অসুস্থতার শেষ সময়ে আমি তার ছায়াসঙ্গি হয়ে ছিলাম পাঁচ বছর। নিজের জীবনের সকল সুখ দুখ , সাফল্য আর ব্যাথতার কাহিনী তিনি আমাকে বলেছেন। তবে জীবনের চাওয়া পাওয়া নিয়ে তার কোন দু:খবোধ ছিল না, ছিল না না পাওয়ার কোন আফসোস। তিনি তার সফলতার গল্প বলতেন। আল্লাহর প্রতি তার ঈমান ছিল পাহাড়সম ইয়াকীনের মতো। তার এই ঈমানী দৃঢ়তা ও খোদার প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা ছিল বলেই হয়তো হাজারো মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তিনি আজীবন সিক্ত ছিলেন। সম্মান আর মর্যাদার অসমান্য এক ফয়যনে তিনি ছিলেন সুভাসিত।
 
আব্বাকে কাছে থেকে দেখার এই বিষয়গুলো আমার মনে হলো লিখে রাখা দরকার। এই দায় আমাকে বারবার পীড়িত করে। দুনিয়ার সকল সন্তানেরই পিতা-মাতার উপর একটি দায় থাকে। জন্মদাতার কাছে যে ঋন বা দায়থাকে তা কখনো শোধ করা যায় না। কোন কালির অক্ষরেতা লিখা যায় না। কোন ভাষায় তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কোন শব্দে তা গাথা যায় না। কোন শৈল্পিকতায় তা আঁকা যায় না। কেবল অনুবভ করা যায়। তবে বিবেকের তাড়নায় অনেক সন্তানই পিতা মাতার স্মৃতি রক্ষায় চেষ্টা করে সেই দায় পূরণের। যেহেতু সব পিতার মতোই স্বাভাবিকভাবে আমার  আব্বাও মনপ্রানে চাইতেন আমি তার ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হই। তার চেতনার উত্তরাধিকার হই। তার মতোই কলমের শানিত ধারায় উম্মাহর খেদমতে নিমগ্ন হই। তার মতোই আমলে আখলাকে উন্নত হই। তিনি চাইতেন আমাদের আকাবির আসলাফের দেখানো পথে তার মতোই যেন আমি আদর্শের পতাকাবাহী হই। দেশপ্রেম , উম্মাহ দরদ আর আদর্শে অবিচল একজন মানুষ হই। নিজের দূর্বলতা আমিই ভালো জানি। আমি একজন সফল পিতার অযোগ্য সন্তান। বাবার চিন্তা চেতনা কর্মের কাছে আমি অতি ক্ষুদ্র এক নাখান্দা বান্দা। তবুও পিতার হাত ধরেই যেহেতো লেখালেখিতে জড়িয়ে ছিলাম শৈশব থেকেই, সেই দায় মেটাতে তাকে নিয়ে কিছু লেখা আমাকে তাড়িত করে। আমার হাত দিয়ে আমি অনেক বড়বড় মনীষার জীবনী লিখেছি। কুরআনের তাফসির, সীরাত থেকেত শুরু কওে মৌলিক ও অনুবাদ মিলিয়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থ লিখেছি, কিন্তু আব্বাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার মাঝে যে ভাবাবেগ ও স্মৃতিকাতরায় বারবার আমি আক্রান্ত হয়েছি এটি অন্যকোন লেখায় হইনি। 
 
লেখক ও মনীষারা যে জায়গায় হাঁটতেন, বাস করতেন, পড়তেন, পড়াতেন, যে বাজারে মাছ কিনতেন, এমনকি যে পুকুরে গোসল করতেন সব কিছু ইতিহাস হয়ে উঠে কালের পরিক্রমায়। আমাদের দেশে নজরুল, রবিন্দ্রনাথ কিংবা সৈয়দ মুজতবা আলীর উপর সেভাবেই গবেষনা হয়েছে বা হচ্ছে। আব্বার উপর অনেকেই লিখেছেন,সমকালীন বাংলা সাহিত্যেও শীর্ষ অনেক লেখেকের রচনা আছে আব্বাকে নিয়ে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ থেকে শুরু করে, আমাদের অন্যতম দিকপাল মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান থেকে ধরে ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আব্দুল গফুর, ড. আ
শরাফ সিদ্দিকী, ড. কাজি দ্বীন মুহাম্মদ, সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার থেকে শুরু করে সমকালীন অনেক মনীষাদের মূল্যায়ন ও স্মৃতি চারন আছে। আব্বার উপর বৃহৎ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করার পরিকল্পনাও আছেআমাদের। আরো অনেক গবেষক গবেষনা করবেন। লিখবেন। হয়তো কোন এক সময় তার উপর পিএইসডি ,এমপিল এর থিসিস হবে বলে আমার বিশ্বাস। যদি দেশের অনেক পিএইসডি থিসিসে তার রেফারেন্স ও গবেষনা ইতোমধ্যে স্থান করে আছে। হাজার পৃষ্ঠার আব্বার “আত্মজীবনী” গ্রন্থ কাছাকাছি সময় ছাপা হবে ইনশাআল্লাহ। সেসব গ্রন্থে আব্বার জীবনের পুরো দিক ও বিস্তৃতি কমর্ময় জীবন পুর্নাঙ্গ ফুঠে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
 
এই গ্রন্থ কেবল লেখক সন্তান হিসাবে একটি দায় মেটানোর চেষ্টামাত্র। যদিও আমি জানি এই দায় এই রচনার মাধ্যমে মেটানো কখনো সম্ভব নয়। তবুও মানসিক শান্তনার জন্য, আমার সন্তান, ছাত্র ও পাঠকদের খানিক তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়াস মাত্র। পরবর্তি প্রজন্ম কিংবা আব্বার ভক্ত শুভাখাংকি ও ছাত্রদের জন্য কেবল কিছ সামান্য রেখাচিত্র অঙ্কন করার চেষ্টা মাত্র এই গ্রন্থখানি। কোন লেখকপুত্রের জন্য এটি একটি লজ্জার বিষয়, তিনি অনেক কিছু লিখেন বা লিখছেন, সারা দুনিয়ায় তার অগনিত পাঠক তা পড়ছে, কিন্তু আপন লেখক পিতা সম্পর্কে তার কোন লেখনি নেই। তার প্রসিদ্ধ, ও মনীষাদীপ্ত এবং প্রন্ডিত্যেও অধিকারি পিতার জীবনের দর্শণ , স্বাধীকার আন্দোলন, শিক্ষা দ্বীনী খেদমত,পুস্তক রচনা, বিস্তৃত লেখালেখি ও রচনার বিবরণ দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেননি। যা আগামি প্রজন্মের পথপ্রদর্শক ও চেতনাকে শানিত করতে প্রেরনার উৎস হিসাবে কাজ করবে। 
 
বিশেষ করে এমন একজন মনীষা ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় পিতাজী, যার সারাটি জীবন কেটেছে উলামায়ে কেরামারের খেদমত , মহব্বত, পদাঙ্ক অনুসরণ করে। আজীবন আমাদের আকাবিরদের জীবনী রচনা, লালন ও বিকাশে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। পাক ভারত উপমহাদেশের র্শীষ বুর্জুগ মনীষা, সমাজ সংস্কারক, আযাদী আন্দোলনের বীর সেনাননী যারা ও আমাদের স্বাধীকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কর্মকান্ড, ইতিহাস সংরক্ষন, রচনা ও প্রকাশ করা ছিল যার জীবনের অন্যতম সাধনা।তাদের নাম ও কর্মকে জীবিত রাখতে তিনি নিজের জীবনের স্বর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। ফলে লেখক পুত্রের জন্য লেখক পিতার জীবনী রচনা কেবল পিতা পুত্রেরসম্পর্কের মাঝেই সীমাবদ্ধ না থেকে এই রচনা আমাদের জাতীয় ইতহাসের গুরুত্বপূর্ণ আকর হয়ে উঠতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
 
আব্বার জীবনের চারটি দিক এই গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে
১. পরিবার ও ব্যাক্তিগত জীবন
২. শিক্ষকতা ও দ্বীনী খেদমত
৩. আধ্যাতিক্বতা ,রাজনৈতিক দর্শন ও স্বাধীকার আন্দোলন
৪. সাহিত্য সাধনা ও রচনা
মূলত এই চারটি বিষয়ের উপরই আলোকপাত করে একজন বহুমুখি কমতৎপর মনীষার জীবনের নানান দিক ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন অমায়িক হুসনে আখলাকের মানুষ।আব্বার সামাজিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সাহিত্যচর্চার শত ব্যাস্থতার ভীতর দিয়েও ব্যাক্তিগত আমল ছিল অনেক উঁচু পর্যায়ের। ব্যাক্তিগত কুরআন তেলাওয়তে তিনি ছিলেন আসক্তিময়, নফল নামাজ ও কিয়ামুল লাইল ছিল তার প্রিয় কাজের অন্যতম। শেষ রাতে জিকির, রোনাজারী ও তাহাজ্জুদে তিনি আজন্ম অভ্যস্থ ছিলেন। হক্কুল্লার পাশাপাশি তিনি বান্দার হকের বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তার মৃত্যুরসময় তার এক টাকা কোথাও ঋন ছিল না। কেই তার কাছে কোন সামান্য হকও পেত না। তিনি বান্দার হক আদায়ের ব্যাপারে ছিলেন অত্যান্তযতœশীল। দ্বীনের বিষয়ে কোন ছাড় দিতেন না। তওবা ইস্তেগফার ছিল তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট। মৃত্যুর আগে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কয়েক বছরে রাতদিন অন্তত কয়েক লক্ষ বা কোটির কাছাকাছি তাসবিহাত তিনি আদায় করেছেন। হালাল রিজিক ভক্ষন ও নিজে আয় করে খাওয়া ছিল তার স্বভািবজাত বৈষিষ্ট। দ্বীন দিয়ে দুনিয়া কামাই করা ছিল তার অপছন্দ। দ্বীনের সকল কাজ করতেন আল্লাহরওয়াস্তে। কারো ক্ষতি করা বা মনে সামান্য আঘাত দেয়াকে তিনি বরতাশত করতে পারতেন না। তিনি সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পছন্দ করতেন। ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকতেন আর অন্যায়ের বিষয়ে তিনি প্রতিবাদী হতেন। তিনি ছিলেন শরীয়তের পাবন্দ ও ইসলামী অনুশাসন মানার বিষয়ে আকাবির আসলাফদের মতো মজবুত । আবার সকল ধর্মমতের মানুষদের সাথে কাজ করতে পারেতেন। কারো মতের উপর জোড় কাটাতেন না। ফলে নানান মত পথ ও ধর্মের লোকজন তারথেকে উপকৃত হতে পারতো।
 
 গ্রন্থেও শুরু ও শেষে আব্বার সাথে আমার স্মৃতিচারনে পাঠক তার ব্যাক্তিগত জীবনের নানান দিক তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া আব্বার শিক্ষকতার জীবনের পাশাপাশি , দ্বীনী খেদমত তুলে ধরা হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদরাসা। দ্বীনী ও সামাজিক নানা খেদমতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন আজীবন।  তিনি সুলুক ও তাসাউফের মেহনতের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। আযাদী আন্দোলনের বীর সেনানী ,শায়খুল আরব ওয়াল আজম ,কুতবে আলম শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ এর সিলসিলায় বাইয়াত ও তার চেতনার ধারক বাহক ছিলেন। ত্বদীয়পত্র জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এর সর্বভারতীয় সভাপতি আওলাদে রাসুল ফেদায়ে মিল্লাত সৈয়দ আসআদ মাদানী রহ এর সাথে তার আধ্যাত্বিক ,সুলুক ও তাসাউফের সম্পর্ক ছিল।সিলেটে ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তে ঊলামায়ে ইসলাম, ও ইসলামী রেনাসার আন্দোলনে আমাদের বাড়ির আলেম উলামা ও মুরুব্বিদের ব্যাপক প্রভাব ছিল সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে। জমিয়তের অনেক শীর্ষ বৈঠক হয়েছে এই বাড়িতে । পরবর্তীতে মাদানী রহ এর ছাহেবজাদা দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন ফেদায়ে মিল¬াত আসআদ মাদানী রহ এর সাথে সিলেটবাসীর ও মাদানী রহ এর খলিফাগনের সুগভীর তাল্লুক ছিল। ফেদায়ে মিল¬াত রহ যতবার সিলেট আসতেন তার খলিফাগন সাথে থাকতেন আব্বা সেসব সফরে সঙ্গি হতেন। এই আধ্যাত্মিক সিলসিলার দ্বীনী খেদমত ও ইসলাহি প্রভাব সিলেট ও আসাম অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক বিস্তৃতিময় প্রভাব ছিল। আব্বা আজীবন ফেদায়ে মিল-াত রহ এর মুরীদ ও হুসাইন আহমদ মাদানী রহ এর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্বিক দর্শনের ভাবশিষ্য ছিলেন।
 
আব্বা তার পীর সৈয়দ আসআদ মাদানী রহ এর অনুসরনে জময়তে ঊলামার রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র ইসলামি দল হিসাবে জমিয়তের অসামান্য অবদান ছিল। সেই স্বর্ণসূত্রে সৈয়দ আব্দুল্লাহ উনসত্তরের গনআন্দোলন,৬দফার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষে কাজ করেন। পারিবারিবভাবে সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ দর্শনের প্রভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধীতা ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের পবিরবারের মুরুব্বিগন সোচ্চার ছিলেন। তারা পাকিস্তান সরকারের নানা রোষানলে স্বীকার হন।আমাদের দাদাজান জমিয়ত নেতা বাহুবলের পীর সাহেব খ্যাত মাওলানা আব্দুল হামিদ রহ ছোট মিয়াসাহেব রহ এর উপর রাষ্টদ্রোহ মামলা করে পাকিস্তান সরকার। হুলিয়া জাড়ি করে তাকে হয়রানী করে। ফলে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আমাদের পরিবারের সকল আলেম উলামার একটি ঘৃনা ও ক্ষোভ  কাজ করতো। এই ঘৃনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ৫৯এর গন আন্দোলনে আব্বা  শরীক হয়ে, ৭০ এর নির্বাচনে সক্রিয়অংশ নিয়ে ও ৭১সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে বিজয় মিছিল করে স্বাধীন বাংলাদেশকে পরাধিনতা থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে। 
 
অপর দিকে আমাদের পরিবারের অনন্য মনীষারা  পকিস্তান সৃষ্টির পরপরই পকিস্তানের রাষ্টভাষা বাংলা হওয়ার দাবী তুলে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পরেছিলেন। আব্বার স্বাধীনতা সংগ্রামে কাজ ও গবেষনায় পরিবারে এই দুই ধারার ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল বলে আমার মনে হয়।  আমাদের পরিবারের আলেম উলামাদের পক্ষ মাদানীদর্শনের উপর থেকে পকিস্তানের কট্টর বিরোধীতা আর আমাদের পরিবারের অপর বুদ্ধিজিবী মনীষাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের রাষ্টভাষা উর্দুর বিরোধীতা ছিল আব্বার রক্তে মাংশে মিশ্রিত একটি স্বাধীনতাকামী চেতনা।ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ারও আগে ১৯৪৭ সালের ৩০ নবেম্বর অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার মাত্র আড়াইমাস পরই সৈয়দ মুজতবা আলী সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের এক সভায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটি পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্টভাষা বাংলা করার প্রথম আনুষ্ঠানিক দাবী ছিল।  রক্ষণশীল লোকজন সে সময় তাঁকে হয়রানি করেছিল ও হুমকি-ধমকি দিয়েছিল। কিন্তু অদম্য মুজতবা দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ধরে সাহসিকতার সঙ্গে যুক্তি সহকারে তাঁর বক্তব্য পেশ করেছিলেন এবং নিজ দাবি পরিত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যা পরবর্তিতে “পাকিস্তেনের রাষ্ট্রভাষা” নামে পুস্তকারের প্রাকাশিত হয়েছিল। এর ফলে সৈয়দ মুজতবা আলী সরকারি কলেজের অধক্ষ্য এর পদ থেকে অপসারিত হন ও পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় স্বীকার হন।  ১৯৭১ সালে সৈয়দ মুজতবা আলী কলকাতার জনপ্রিয় রেডিও আকাশ বানীর স্টেশন ডাইরেক্টর ছিলেন, তখন তিনি নিয়মিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষে সংবাদ, নাটিকা, খবর তথ্য প্রচার করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে থাকেন। ফলে আব্বা পলাশি থেকে একাত্তর, আমাদের সকল আযাদী আন্দোলন ও স্বাধীকার আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি, সক্রিয় কাজ করা ছিল সেই শানিত চেতনার ফসল। যা সচরাচর আমাদের দেশে ইসলামি লেখক ও ইসলামি রাজনৈতিকদের মাঝে খোঁজে পাওয়া যায় না। লেখালেখি ও সাহিত্য সাধনা ছিল আব্বার রক্তধারায় মিশ্রিত পারিবারিক ঐতিহ্যের এক প্রবাহমান ধারা।বহু ভাষাবিদ পন্ডিত ড. সৈয়দ মুজতবা আলী, ইতিহাস গবেষক সৈয়দ মর্তুজা আলী ও লেখক সৈয়দ মুর্তাজা আলী আব্বার লেখালেখির মানস গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।ফলে আব্বার সকল পরিচয় ছাড়য়ে সাহিত্য চর্চা ও লেখক পরিচয় সব মহলে পরিচিত হয়ে উঠে। লেখালেখি ও সাহিত্য সাধনা ছিল তার সত্তা জুড়ে। তিনি যেমন ছিলেন একজন খূরধার লেখক ও ইতিহাস গবেষক তেমনি ছিলেন একজন পুরোধা সাহিত্য সংগঠক। বাংলা একোডেমি , সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ এর মতো এতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। গড়ে তুলেছেন মহাকবি সৈয়দ সুলতান সাহিত্য ও গবেষনা পরিষদ, তরফ সাহিত্য পরিষদ, হবিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ, বাহুবল প্রেসক্লাব, বাহুবল পাবলিক লাইব্রেরী, পুরাত্ব গবেষনাগার ও সংগ্রহশারার মতো সুনামখ্যাত প্রতিষ্ঠান।
 
 
আজীবন গ্রামে বাস করা একজন শিক্ষক তার কর্মের পরিধি দিয়ে কতো উজ্বলতম আলোকধারার বিকরণ তৈরি করেচারদিককে রৌশনিময় করে তুলতে পারেন আব্বা সৈয়দ আব্দুল্লাহ ছিলেন তার অনন্য উদাহরন। যার নজির ও উপমা এই সমাজচিত্রে অহনিশ নেই। তাই আব্বার জীবনের বৈচিত্রময় আদর্শিক দিকগুলো এজন্য লিপিবদ্ধ করা যাতে করেআমাদের আগামি প্রজন্ম দেশ মাতৃকার আদর্শিক চেতনায় শানিত হতে পারে। 
 
আল্লাহ আব্বার সকল খেদমতকে কবুল করুন। তার কবরকে নুর দিয়ে ভরে দিন। আমিন
 
 
সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
ঢাকা , ১৪ আগষ্ট ২৫


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ