রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মানিক মিয়া এভিনিউতে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সংঘর্ষের এই ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ আন্দোলনকারী জুলাই যোদ্ধাদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। সেই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর লাঠিপেটায়
অর্ধশতাধিক জুলাই যোদ্ধা আহত হয়েছেন।
এ ঘটনার জেরে গতকাল সন্ধ্যার পর জুলাই সনদ বাতিলের দাবিতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিক্ষোভ করেন জুলাই যোদ্ধারা। একই সময়ে রাজধানীর আরো কয়েকটি এলাকাসহ চট্টগ্রাম, ফেনী, দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন জুলাই যোদ্ধারা। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, এসব ঘটনার জেরে সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে।
সরেজমিন : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আইনি সুরক্ষা, জুলাই আহতদের বীর হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে গতকাল সকাল ১০টার দিকে জুলাই যোদ্ধারা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে জড়ো হন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ভিড় বাড়তে থাকে। সকাল ১১টার দিকে তাঁদের একটি অংশ সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করা মঞ্চের সামনে অবস্থান নেয়। অন্য একটি অংশ সংসদ ভবন এলাকায় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রবেশ করে।
ওই ঘোষণার পরও জুলাই যোদ্ধারা সেখান থেকে না সরলে পুলিশ তাঁদের ধাওয়া দিয়ে এবং লাঠিপেটা করে সরানোর চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।
এ সময় জুলাই যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে সংসদ ভবনের বাইরে কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন। সড়কে টায়ার ও কাঠ এবং অনুষ্ঠানের জন্য বাইরে তৈরি করা তাঁবু একত্র করে তাঁরা আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশের লাঠিপেটায় আহত কয়েকজনকে এ সময় হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধাওয়ায় জুলাই যোদ্ধারা খামারবাড়ি মোড় ও আসাদগেটের দিকে অবস্থান নেন।
দুপুর আড়াইটার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারী জুলাই যোদ্ধাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ছোড়েন। এরপর পুলিশ শুক্রাবাদ মোড়ে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীরা আশপাশের গলিতে অবস্থান নেন। জুলাই যোদ্ধারা এক পর্যায়ে ধানমণ্ডি এলাকার মিরপুর সড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তাঁদের ভিডিও ধারণ করা পথচারীদের ফোন কেড়ে নিয়ে ফুটেজ মুছে দেন তাঁরা।
পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারী জুলাই যোদ্ধারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছেন। এতে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পুলিশের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর এবং এমপি হোস্টেলের সামনে পুলিশের দুটি নিরাপত্তা চৌকিতে আগুন ধরিয়ে দেন।
সংঘর্ষের কারণে এক পর্যায়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে সাধারণ মানুষের হেঁটে চলা বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সড়কটিতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এভাবে দুপুর আড়াইটার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। তবে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকেও খামারবাড়ি চত্বরে জুলাই যোদ্ধাদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রেদওয়ানুল হাসান নামের একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকারকে উত্খাত করতে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা আহত ও নিহত হয়েছেন। পুলিশের এই সদস্যরা তাঁদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। আজ আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে এখানে জড়ো হলে সেই পুলিশ সদস্যরাই আমাদের ভাইদের ওপর হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০ জন সহযোদ্ধা আহত হয়েছেন।’
জুলাই যোদ্ধাদের তিন দফা : ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’ সংগঠনের নেতৃত্বে তিন দফা দাবি আদায়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন জুলাই যোদ্ধারা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ছাত্র-জনতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও জুলাই আহতদের বীর হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে; আহতদের জন্য আইনগত সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এই দাবিগুলো জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এ অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
যা বলেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ : জুলাই যোদ্ধাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই সনদে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, জুলাইয়ের বীর যোদ্ধা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫ নম্বর দফায় পরিবর্তন করা হয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যেই উত্তেজনা : দফায় দফায় জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যেই আকাশে কালো মেঘ দেখা দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হয় বৃষ্টি। কিন্তু এতেও ওই এলাকায় উত্তেজনা কমেনি। এর ফলে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্বনির্ধারিত সময় বিকেল ৪টা থেকে পিছিয়ে কিছুটা পরে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়।
সংঘর্ষে আহত ২০ জন ঢাকা মেডিক্যালে : জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত অন্তত ২০ জন জুলাই যোদ্ধা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টার পর থেকে একে একে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন সিনথিয়া মিম, শফিকুল ইসলাম, শফিউল্লাহ, হাবিব উল্লাহ, তানভিরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, আতিকুল গাজী, রাকিব, লাইলিসহ আরো অনেকে।
আহত আতিকুল গাজী জানান, তাঁর বাসা উত্তরা এলাকায়। স্বাক্ষর হতে যাওয়া জুলাই সনদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা মানিক মিয়া এভিনিউতে এসেছিলেন। সেখান থেকে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা করে। এলোপাতাড়ি লাঠির আঘাতে আহত হন তাঁরা।
রাস্তায় পড়ে ছিল জুলাই যোদ্ধার কৃত্রিম হাত : জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অবস্থান করা জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় এক জুলাই যোদ্ধার কৃত্রিম হাত রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জুলাই সনদ বাতিলের দাবিতে সংসদ ভবন এলাকায় বিক্ষোভ : জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে বিক্ষোভ করছেন জুলাই যোদ্ধারা। তাঁরা বলেন, এই সনদ তাঁরা মেনে নেবেন না। কারণ এতে জুলাই আন্দোলনে আহতদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এ সময় যোদ্ধাদের ওপর হামলার বিচার দাবি করেন তাঁরা।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শতাধিক জুলাই যোদ্ধা মিছিল নিয়ে সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন তাঁরা।
আটক ২, মামলা প্রক্রিয়াধীন : জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিপেটা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
পুলিশ জানায়, বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে উপকমিশনার তানভীর আহমেদসহ অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য আহত হন। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের পাঁচটি গাড়ি এবং অস্থায়ী কন্ট্রোলরুমে আগুন দেওয়া হয়।
রবিবার সারা দেশে মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা জুলাই যোদ্ধাদের : প্রতিবাদে রবিবার সারা দেশে তিন ঘণ্টার মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন জুলাই যোদ্ধা সংসদের মুখ্য সংগঠক মাসুদ রানা সৌরভ। তিনি বলেন, ‘তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন ও হামলার প্রতিবাদে রবিবার দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রতিটি জেলা শহরের মহাসড়কে অবরোধ চলবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সনদের পঞ্চম ধারায় আহত ও শহীদ পরিবারদের আইনি নিরাপত্তার বিষয়টি নেই। এটি প্রতারণা।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিয়েছিলাম। আলোচনার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ বুট ও লাঠি দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়।’