শান্তিতে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নোবেল কমিটি বলছে, ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সংগত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তর অর্জনের সংগ্রামের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী হিসেবে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর নাম ঘোষণা করা হয়। মাচাদো এমন সময় এই পুরস্কার পেলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার জনসমক্ষে বলেছেন যে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য।
২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা নিকোলাস মাদুরো সরকারের অন্যতম কড়া সমালোচক ৫৮ বছর বয়সী মাচাদো একজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার। ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র আন্দোলনের
নেত্রী হিসেবে মাচাদো সাম্প্রতিক সময়ে ল্যাটিন আমেরিকার সাহসী নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একজন। তাঁকে ভেনেজুয়েলার ‘লৌহমানবী’ও বলা হয়ে থাকে।
নোবেল কমিটি তাঁকে এমন এক নারী হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি অন্ধকার সময়েও গণতন্ত্রের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। নোবেল কমিটির ভাষায়, ‘২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলো শান্তির পক্ষে একজন সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ এক সৈনিকের নামে, একজন নারীর নামে, যিনি বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অন্ধকারের মধ্যেও গণতন্ত্রের শিখা জ্বালিয়ে রেখেছেন।’
ভেনেজুয়েলায় রাজনীতি যখন গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তখন রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মাচাদো ছিলেন এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এমন একটি বিরোধী দল, যারা অবাধ নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের দাবিতে যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পেয়েছিল।
ভেনেজুয়েলা তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ দেশ থেকে একটি নিষ্ঠুর, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যা এখন মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে নোবেল কমিটি মনে করে। ভেনেজুয়েলার বেশির ভাগ মানুষ গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে, যেখানে রাষ্ট্রের সহিংস যন্ত্রণা দেশের নিজস্ব নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। নির্বাচনী কারচুপি, আইনি মামলা এবং কারাদণ্ডের মাধ্যমে বিরোধীদের পরিকল্পিতভাবে দমন করা হয়েছে বলে নোবেল কমিটির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে মাচাদো বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তখন সরকার আদালতের মাধ্যমে তাঁর প্রার্থিতা আটকে দেয়। এরপর তিনি নির্বাচনে ভিন্ন দলের প্রতিনিধি এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে সমর্থন দেন এবং রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবককে একত্র করতে সমর্থ হন। সে সময় স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। হয়রানি, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সারা দেশের নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রের ওপর নজর রেখেছিল। তারা সরকারকে বাধ্য করেছিল ব্যালট নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে এবং ফলাফল সম্পর্কে মিথ্যা বলার আগে চূড়ান্ত গণনা নথিভুক্ত করতে। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের সময়, উভয় ক্ষেত্রেই সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রচেষ্টা ছিল উদ্ভাবনী, সাহসী, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক। বিরোধী দলের নেতারা দেশের নির্বাচনী এলাকা থেকে সংগৃহীত ভোট গণনার ফল প্রকাশ করলে তা আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করে। সেখানে দেখা যায় যে বিরোধী দল স্পষ্ট ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখে।
নোবেল কমিটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে স্থায়ী ও টেকসই শান্তির পূর্বশর্ত। তবে আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে গণতন্ত্র পিছিয়ে পড়ছে, যেখানে ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্রের নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছে, যদিও ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থার ক্ষমতার ওপর কঠোর দখল এবং জনসংখ্যার ওপর দমন-পীড়ন বিশ্বে একমাত্র নয়। আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখতে পাই যে নিয়ন্ত্রণকারীরা আইনের শাসনের অপব্যবহার করছে, মুক্ত গণমাধ্যমকে নীরব করছে, সমালোচকদের কারারুদ্ধ করছে এবং সমাজকে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যদিও ২০২৪ সালে আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তবে ক্রমেই কমসংখ্যক নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।’
শান্তির নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, ‘যখন কর্তৃত্ববাদীরা ক্ষমতা দখল করে, তখন স্বাধীনতার সাহসী রক্ষকদের স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্র নির্ভর করে এমন মানুষের ওপর, যারা নীরব থাকতে অস্বীকার করে, যারা গুরুতর ঝুঁকি সত্ত্বেও এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেখায় এবং যারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বরং সর্বদা রক্ষা করতে হবে কথার মাধ্যমে, সাহসের সঙ্গে এবং দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে।’
মারিয়া কোরিনা মাচাদো শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার জন্য আলফ্রেড নোবেলের উইলে উল্লেখিত তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করেন বলে নোবেল কমিটি জানায়। তিনি তাঁর দেশের সরকারবিরোধীদের একত্র করেছেন। ভেনেজুয়েলার সমাজের সামরিকীকরণ প্রতিরোধে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের জন্য তিনি তাঁর সমর্থনে অবিচল ছিলেন।
মারিয়া কোরিনা মাচাদোর জন্ম ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদে বিরোধীদলীয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ এবং ১১ মিলিয়ন ক্রোনার। আগামী সোমবার ঘোষণা করা হবে বিকল্প নোবেল হিসেবে পরিচিত অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম।