দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশে গুম, গোপন আটক ও নির্যাতনের অভিযোগে গত ৯ অক্টোবর ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। আদালতের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলে সন্তোষ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিও)।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে প্রতিক্রিয়া জানায়।
এ নিয়ে সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি একটি প্রতিবেদন লেখেন।
বাংলাদেশে গোপনে আটক রাখা ও গুম করা নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল উল্লেখ করে এইচআরডব্লিউ বলেছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সেই প্রতিবেদনকে ‘অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বেশির ভাগ ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, তারা গ্রেপ্তারের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানো অপরাধী, ঋণখেলাপি কিংবা প্রতারক।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ওই সময় তার জোর দাবির কারণে আসাদুজ্জামান তদন্তের আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও বাক্স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা বেড়েছে। সরকার সাধারণত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে তিন সপ্তাহের টানা আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন এবং হাসিনা সরকার পতন ঘটে।
তদন্তে দেখা যায়, তিন শতাধিক ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। কমিশন সম্প্রতি ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যাতে গুম ও নির্যাতনের ভয়াবহ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলের এসব গুমের ঘটনার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
মীনাক্ষী বলেন, অভিযোগ ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন সেইসব পরিবারের সদস্যরা, যাদের ঘটনা আমরা নথিভুক্ত করেছিলাম। তাদের মধ্যে একজন হলেন মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান নামে পরিচিত)। ২০১৬ সালে নিখোঁজ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি আমাকে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তাকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন আটককেন্দ্রে আট বছর আটকে রাখা হয়। হাসিনার সরকার পতনের পরই তিনি মুক্তি পান।
ওই প্রতিবেদনে মীনাক্ষী আরও বলেন, এই দীর্ঘ বছরগুলোতে তার স্ত্রী বারবার আমার কাছে ফোন করতেন, খবরের জন্য আকুল হয়ে যেতেন—গুম হওয়া বহু পরিবারের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক করুণ চিত্র। সম্প্রতি আরমান আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি সুস্থ আছেন এবং একটি বইও লিখেছেন। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমরাও এমন অলৌকিক ঘটনার অপেক্ষায় থাকি। তবে প্রায়শই মানবাধিকার লঙ্ঘন চলতে থাকে। অভিযুক্তদের বিচার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে। তবে, সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে এখনও উদ্বেগ রয়ে গেছে।